রেডিও-টেলিভিশনের কথাতো আগের কোন এক পর্বেই বলেছি। ছাপোষা গ্রাম-বাংলা এই বিনোদনের স্বাদও আত্মস্বাৎ করতে শিখেছে ‘অনেক পরে’। তথাকথিত শহুরে বাবুদের ‘বোকা বাক্স’ই বিস্তীর্ন পল্লী-গ্রামের বিনোদনের প্রধান অঙ্গ ছিল এবং অনেকক্ষেত্রে আছে এখনও। যদিও রঙ্গীন হাই কোয়ালিটি বা ফোর-কে পাল্টে ফেলেছে সাদাকালোর সেই মোড়ক।
যে সময়ের কথা বলছি তখনও রঙিনের ছোঁয়া লাগেনি দুই চোখে। বলা বাহুল্য দুই বাই দুই ফুটের বাক্সটিই উন্মাদনার চরমে। নাহঃ বিদ্যুৎ আসেনি তখনও এপাড়ায়। গ্রামের কিয়দংশেই পৌঁছেছে সে আধুনিকতার ছোঁয়া। মূলত সেচের কাজের সুবিধার্থেই ডিপ-টিউব বা মিনি-টিউব পাম্প চালাতে বিদ্যুতের ব্যবহার হত বেশী। সে গল্পও শোনাবখন কোন এক পর্বে। তা, এখানে মনে হতেই পারে বিদ্যুৎ নেই অথচ টিভি চলত কিভাবে..? চলত মশাই, চলত..!
অধুনা ইনভার্টার যে সিস্টেমে চলে, অর্থাৎ চার্জেবল ব্যাটারির মাধ্যমে এটিও চালানো হত। যেহেতু পাড়ায় বিদ্যুৎ নেই তাই সেই ব্যাটারি চার্জ দিতে নিয়ে যাওয়া হত আমাদের বাজারে, ইলিক্ট্রিক সামগ্রী বিক্রীর দোকানে। প্রতিদিনই খান বিশেক ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হত দোকানটিতে। অবিশ্যি তার জন্যে চার্জ প্রতি কিছু ভাড়াও ধার্য্য ছিল।
আমাদের পাড়ায় খান পনেরো বাড়ির মধ্যে একটি বাড়িতেই ছিল এই বিশেষ যন্ত্রটি। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা; ওই যন্তরই ভরষা। খেলা, খবর, বিশেষ কোন অনুষ্ঠান বা রবিবারের ছায়াছবি। ছুটির দিনে আমাদের খুব আনন্দ বেড়ে যেত বেশ কয়েকগুন। পাড়ার প্রায় সবাই একজায়গাতে জটো হত নিত্য নুতন চলচিত্রের মজা নিতে। কখনও হাসি, কখনও উদ্দীপনা, কখনও চোখে জল নিয়ে সবার দৃষ্টি ফেরানো থাকত সাদাকালো চার স্কোয়ারফুটের সেই স্ক্রিনটির দিকে।
আর মজা হত মহালয়ার দিন, ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে রেডিওতে যেই শেষ হত বীরেনকেষ্টর ধারাভাষ্য, অমনি হামলে গিয়ে পড়তাম টিভির সামনে। প্রবল উৎকণ্ঠা চোখে মুখে, কখন শুরু হবে ‘মহিষাসুর মর্দিনী’। প্রতি বৎসর এক নিয়ম।
চলতে চলতে হঠাৎ হঠাৎ সিগন্যাল খারাপ হয়ে গেলে রগড় বাঁধত বেশ। যত রাগ, অভিমান, আক্রোশ গিয়ে পড়ত এন্টেনার ওপর বা তার ওপরে উড়ে এসে বসা কাক-পায়রা-টিয়াটির ওপর। একজন দৌড়ত ছাদে সিগন্যাল ঠিক করতে। আমাদের ছোটদের ওপর ভার পড়ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সঠিক বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ার যাতে ওপরে যাওয়া ব্যক্তিটি সিগন্যাল আসার সঠিক এঙ্গেলটি ধরতে পারে।
“…এসেছে? …না, ডানদিকে ঘোরাও একটু। …হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসছে, আর একটু, আর একটু। …উফফ ঠিক এসেছিলো, তুমিই বেশি ঘুরিয়ে ফেললে, আবার বাঁয়ে ঘোয়াও হালকা। …হ্যাঁ এবার ঠিক এসেছে নেমে এসো” এসব ছিল নিত্য ব্যাপার। এই রগড় আরও জমত খেলা দেখার দিন। কোত্থেকে যত পাখির ঝাঁক এসে জুটত সে দিনগুলিতেই আর আমাদের এন্টেনা ঘুরিয়ে সিগন্যাল ঠিক করতে বা পাখি তাড়িয়ে বেড়াতেই খেলার অকেনটা অংশই অদেখা থেকে যেত।
রবিবারের ছায়াছবি শেষ হলে শুরু হত সংবাদ। কখনও সখনও চলচিত্রের পরিমাপ কিয়দংশে বড় হলে সংবাদের পর তা পরিবেশন করা হত। সে এক অধীর আগ্রহে বসে থাকতে হত সকলকে। প্রথমে বাংলা, পরে হিন্দি তারও পরে ইংরিজি; উফফ বড্ড বিরক্তিকর। একই খবর হরেক ভাষায়!
রাত আটটায় ‘শ্রী কৃষ্ণ’, তারও পরে সম্প্রচার হত ‘মুঙলী’। আহঃ কত যে মার কপালে জুটেছে সেই অমূল্য এপিসোডগুলি দেখতে। জীবনের প্রথম দেখা কার্টুন-অ্যানিমেশন। সবার শেষে হত আলিফ লায়লা। কিন্তু সারা রাত বাড়ীর বাইরে কাটাতে হবে ভেবে তা দেখার সাহস হয় নি কখনও।
(ক্রমশ)