নাঃ গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক আলোচনা করার কোন অভিপ্রায় আজ একদমই নেই। হয়তো সে যোগ্যতাও ছিল না কোনদিন। নির্দিষ্ট কোন দলের ক্যাডার অথবা সমর্থকও অবিশ্যি কাগজে-কলমে নই। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই পক্ষপাতিত্ব আছে এবং সেটি সুনির্দিষ্ট মতাদর্শের পক্ষেই। এর মানে এটাও নয় যে অন্য কোন রাজনৈতিক মতের ভালো কোন কাজের বিরোধিতা করতে হবে। মোদ্দাকথা এটাই, যা কিছু দেশ এবং দশের জন্যে ভালো তার সপক্ষে দাঁড়াতে পিছপা হয়নি কখনোই। তা সে যেকোন রাজনৈতিক অবস্থানের দ্বারা গৃহীত হোক না কেন। আজও সেই অতিহ্য অটুট রয়েছে। দেখাযাক ভবিষ্যতে এর পদস্খলণ হয় কিনা।
আগেই বলেছি যে আমি নিরপেক্ষ নই; আবার ভিন্ন মতের সমস্ত কাজই খারাপ এটাও মানাও সম্ভবপর নয়। সবসময়ই যেটি গুরুত্ব পায় সেটি হল, নির্দিষ্ট কোন সরকার কতটা ভালো কাজ করছে বা করেছে তার তুল্যমূল্য বিচার। বিষয়টি সহজ করলে এমন দাঁড়ায় যে, ধরাযাক এক্স-সরকার মোট যতগুলি জনমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে তার মধ্যে সরাসরি উপকৃত হয়েছেন মোটামুটি সিংহভাগ জনগণ। সেক্ষেত্রে পরবর্তী বিচার্য বিষয় হবে ওই প্রকল্পগুলোর মধ্যে নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতার পরিমান। পাশাপাশি প্রকল্পগুলি কতখানি ছাপ ফেলেছে বা ভবিষ্যতে ফেলবে সমাজ এবং পরিবেশে। এই অনুসারে প্রাপ্ত নম্বরই সেই প্রকল্প এবং সরকারের পক্ষ অথবা বিপক্ষ নিতে সাহায্য করে আমাকে।
সূদীর্ঘ রাজনৈতিক চর্চা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় গোচরে আসায় সেই অপ্রাসঙ্গিক বিষয়টিতে একটু আলোকপাত করতে ইচ্ছে করল। আশা থাকবে এটি আপনাদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাবে না। বিষয়টি কি খুব জটিল হয়ে যাচ্ছে? আচ্ছা, এবার তাহলে সরাসরি চলে যাই মূলপ্রসঙ্গে..!
বিজ্ঞাপনী বা মার্কেটিং স্ট্র্যাটিজি। কর্মজীবনে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থায় লম্বা সময় কাটানোর পর এই উপলব্ধি বা শিক্ষা হয়েছে যে, নিজের প্রয়োজনেই নিজের ভালো কাজের ঢাক নিজেকেই পেটাতে হয়। নইলে বছরান্তে ‘বস’ -এঁরা ছোট্ট কাঁচের ঘরে ডেকে পূর্বনির্ধারিত পারফরম্যান্স বোনাস শুনিয়েই ক্ষান্ত দেবেন। তা আপনার যতই অপছন্দ হোক না কেন। সহজ করে বললে, অনেকক্ষেত্রেই বিশেষ মোসাহেবি না করলে কর্মদক্ষতার সঠিক মূল্যায়নের কোন পরিসরই থাকে না। এক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপারের প্রতিফলন আছে। অর্থাৎ, ভালো হোক কিংবা খারাপ, বিজ্ঞাপনই সাফল্যের এক এবং একমাত্র চাবিকাঠি। যেখানে মুহূর্তেই সততার দাম সঠতার কাছে বিকিয়ে যায়।
আমাদের এই বাংলায় সরকার গৃহীত জনমুখী অনেক প্রকল্প আছে এবং আগেও ছিল বিস্তর। পরবর্তীতে শুধুমাত্র যার নাম পরিবর্তন করে নুতন বলে চালানো হচ্ছে। সে যাকগে; পূর্বতন সরকারের বড় একটি খামতি ছিল তা হল, সঠিকভাবে প্রকল্পগুলোর প্রচার তাঁরা করেননি বা প্রচারে অনীহা দেখিয়েছেন। আর এই প্রচারে খামতি থাকার কারণেই অনেক ভালো কাজগুলো জনমানসে সেভাবে ছাপ ফেলে রেখে যেতে পারেনি অথবা বলা ভালো, জনগণ সেগুলিকে ভুলে গিয়েছেন সময়ের সাথে। ‘মানুষের স্মৃতিশক্তি বড়ই দুর্বল’ কিনা..!
ভাষা এবং বোধগম্যতা। শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয় অন্যান্য সমস্ত বিপননীর প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল বিজ্ঞাপনের ভাষা এবং তার বোধগম্যতা। ভাষা এমন ব্যবহার করা উচিত, যা সহজেই বোধগম্য হয় এবং যার সাথে দৈনন্দিন জীবনের প্রভাব রয়েছে। জনগণ তো আর ডিকশানারি বা অভিধান নিয়ে ঘোরেন না। ফলত, পান্ডিত্য এবং বিচক্ষণতা বোঝাতে কঠিন ভাষার প্রয়োগ যৎসামান্য মানুষের মনে দাগ কাটলেও, বৃহত্তর ক্ষেত্রে সেটি কোন কাজেই আসে না। সাধারণ মানুষ সেগুলি বুঝে ওঠার আগেই অন্য বিজ্ঞাপন তাদের চোখের সামনে চলে আসে। অথবা এক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলঘোষণা হয়ে যায়। তাই ভাষা যত সহজ ও সোজা-সাপ্টা হবে, ততই জনগণ নিজের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার সাথে সেটি মেলাতে পারবে এবং কাছের করে নেবে।
জনসংযোগ ও পিপল সার্ভে। কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, ‘উইজার এক্সপেরিয়েন্স’ একটি সুবৃহৎ প্রক্রিয়া। ‘উইজার এক্সপেরিয়েন্স’ বিষয়টিকে সহজ করে বললে এইরকম দাঁড়ায় যে, কোন ব্যক্তি কোন একটি পণ্য বা পরিষেবা বা পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে তার অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধি কেমন হয় সেটা জানা। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার আগে তার সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট মতামত নিয়ে, সেই মতামতের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের অদলবদল বা সংশোধন করে সঠিক বিকল্পটির রূপরেখা তৈরী করা।
এক্ষেত্রে নিবিড় ‘জনসংযোগ’, বহুল ব্যবহূত, সহজলভ্য, উৎকৃষ্ট এবং ফলদায়ী একটি পদ্ধতি। প্রাত্যহিক যোগাযোগের ফলে জনমানসের মনোভাব বা চিন্তাভাবনা, তাদের চাহিদা বা অভাব-অভিযোগগুলি সহজেই সামনে আসে। যার থেকে ওই অঞ্চল বা স্থানের উপযোগী সঠিক উন্নয়নমুখী প্রকল্প বা নীতি নিয়ে আসতে সাহায্য করে। সরাসরি জনসংযোগ ছাড়াও অধুনা সংবাদ এবং সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে খুব সহজেই জনভিত্তি গড়ে তোলা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি অসুবিধেও আছে এবং সেটি হল সঠিক তথ্যের পরিবেশনা। বিজ্ঞাপিত খবর বা ‘পেড নিউজ’ -এর ভিত্তি এবং সঠিক তথ্য অনেকাংশেই যাচাই না করে, অসৎ উদ্যেশে প্রচারিত হয়। সেই খবরে জনগণ এতোটাই প্রভাবিত হয় যে, তা নিয়ে নিজেরদের মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক-বিতর্কে এমনকি বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। তাই নিবিড় জনসংযোগ ভালো একটি পদ্ধতি।
সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যম। এ এমন একটি দুনিয়া যেখানে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেরই অবাধ বিচরণ। সংখ্যার বিচারে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এখানে নিয়মিতভাবে উপস্থিত থাকেন। এই বিশাল পরিধির বাজারকে ব্যবহার করে নিজেদের মতামত অন্যের কাছে ছড়িয়ে দেওয়াটা অত্যন্ত সহজ কাজ। অনেকাংশে সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই সেই কাজটি করা সম্ভব। পেড সার্ভিস ব্যবহার করলে সহজ কাজটি সহজতর হয়ে পড়ে। এর ফলে বিপুল পরিমান সদস্যযুক্ত মানুষজনকে প্রভাবিত করাও যায় খুব সহজেই। সশরীরে উপস্থিত থেকে জনসংযোগ করার মতো এটাও বেশ একটি কার্যকরী পদ্ধতি। তবে অনেক তাত্বিক লোকজন এগুলি মানতে চান না। কিন্তু বাস্তবকে যত সহজে যে মানতে পারবে তত তাড়াতাড়ি সে নিজের ভালো করতে পারবে।
ফেক নিউজ বা তথ্য। সামাজিক মাধ্যমের দ্বারা সহজেই বিশাল সংখক জনগণের কাছে পৌঁছে যাওয়া যায় বলেই অসত্য বা অর্ধসত্যের তথ্যের রমরমা এখানে। সেই ভিড়ের মাঝে আসল তথ্য হারিয়ে যায়। অনেকাংশে আসলদের চাপা দিতে নকল বা বিকৃত তথ্য বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয় নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ইচ্ছাকৃতভাবে। একটি ভুল তথ্য যে কি মারাত্বক প্রভাব ফেলতে পারে আমাদের জীবন এবং সমাজে তা সহজেই যে কেউ জানতে পারবেন অতি সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলী থেকে। যেখানে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে লড়িয়ে দেওয়া হয় আমাকে-আপনাকে নিজেদের মধ্যেই। আবার এনেকাংশে মিথ্যের রাজপ্রাসাদ গড়ে স্বর্ণপালঙ্কে আপনাকে বসিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন কেউ কেউ। রাজনীতিতে এর প্রভাব বিস্তর। ভয় দেখানো থেকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, বাস্তবের থেকে কম কিছু নেই এখানে। সরাসরি জনসংযোগ না করেও স্রেফ ঠান্ডা ঘরে বসে মিথ্যের পর মিথ্যে প্রচার করে কোন কোন বিশেষ রাজনৈতিক দল এতো ভালো ফলাফল করতে পারে যে তার পরিসংখ্যান চমকে দেওয়ার মতো। বিপুল পরিমান মানুষজন খুব সহজেই প্রভাবিত হয়ে যান কিছু মিথ্যেকে সত্যিকরে দেখানোর মাধ্যমে। এ যেন ঠিক, ‘আহা কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাইরে..!’
আরও বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক বিষয় বিশ্লেষণ করা যায় তবে পর্বটিকে আর দীর্ঘায়িত করব না। সরাসরি উপসংহারে চলে আসি..!
ভোটের ফলাফল আর আগেকারমতো উৎফুল্ল বা নিরাশ করে না। বয়স এবং পরিস্থিতিও এর কারণ হতে পারে। যিনিই জিতুন, যিনিই হারুন; নিজের মুখের গ্রাস অর্জন করতে আমাদের নিজেকেই পরিশ্রম করে যেতে হবে। নিজের পরিজনদের ভালো রাখার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। তা সে ৫০০ টাকার রান্নার গ্যাস বেড়ে ১২০০ টাকা হোক, কিংবা ৫০ টাকার ভোজ্য তেল বেড়ে ২০০ টাকাই হোক না কেন !!
তাই এই হিংসা ও হানাহানী বন্ধ করে বরং “মোরা কাজ করি আনন্দে, মাঠে ঘাটে..!”
(ক্রমশ)