শিখর ছোঁয়ার নেশায় – ১

Abokash > Blog > শিখর ছোঁয়ার নেশায় – ১

ডুয়ার্স! কথাটির অর্থ হল প্রবেশদ্বার। ভুটান ও উত্তর পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার এই ডুয়ার্স। সুউচ্চ হিমালয়ের পাদদেশে বিস্তীর্ণ বনভূমি, উঁচু নিচু পাহাড়, অজস্র নদী, অগণিত চা বাগান আর ছোট বড় জনপদ নিয়ে গঠিত ডুয়ার্স। এই নামের সাথে পরিচয় পাঠ্য পুস্তক ছাড়াও চলচিত্র এবং ধারাবাহিকের মাধ্যমে। আমরা যে চা বাগানগুলি দেখতে অভ্যস্ত তা প্রধানত দার্জিলিং সংলগ্ন। কিন্তু এর পরিধি ছড়িয়ে রয়েছে জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং অধুনা আলিপুরদুয়ার -এর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। এদের মধ্যে রাঙামাটি, কালচিনি, মাকরাপাড়া, ডামডিং, সামসিং প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

এখানকার অধিকাংশ মানুষরা সম্পূর্ণভাবে চা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ঘুম থেকে উঠেই যে পানীয় সেবন না করলে আমাদের প্রভাত “সু” হয় না – সেই চা প্রক্রিয়াকরণে নিযুক্ত এই মানুষগুলি সর্বদা প্রাণপাত করে চলেছেন। আরও অনেক দ্রষ্টব্যের মতই এখানকার মানুষদের সহযোগিতা ও ব্যবহার ভীষণভাবে প্রশংসনীয়।

সাফারি সেরে কুয়াশা আবৃত জঙ্গলের ভেতর দিয়ে জিপসি যখন রিসর্টে পৌঁছে দিল তখন সকাল প্রায় ৮টা। ব্রেকফাস্ট সেরে রেডি হতে লাগল আরো ঘন্টা খানেক। সদন তার বাহন নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। চড়ে বসলাম সকলে। সামনে আমি, মাঝে মহিলা মহল আর পিছনে শোভন ও সুনীল। শুরু হল দিনের দ্বিতীয় সফর..

সকাল ৯টা, ছুটে চলেছি ৩১নং সড়ক দিয়ে। গরুমারার দ্বিতীয় ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস ছাড়িয়ে কিছুটা এগোতেই একটি রেল লাইন। বাম দিকের জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে সেটি কালো মসৃন পিচের রাস্তাটিকে আড়াআড়ি কেটে দিয়ে মিলিয়ে গিয়েছে ডানদিকের জঙ্গলে। রেল লাইনটি মাল জংশন থেকে মালবাজার হয়ে ময়নাগুড়ির দিকে চলে গিয়েছে। সংখ্যায় খুব কম ট্রেন চলাচল করে বলেই বোধহয় সদন গতি মন্থর না করেই সেটি ক্রস করে এগিয়ে চলল।

এঁকে বেঁকে রাস্তা চলেছে ঘন সবুজ জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। সোনালী সূর্যের আলোয় জঙ্গলের ঘুম ভাঙার দৃশ ও ঝিঁঝিঁ-র বিরামহীন ডাকে সম্মোহিত হতে হতে চলেছি। মাঝে মাঝে বনদপ্তরের সাইন বোর্ড গতি রোধ করছে, “ড্রাইভ স্লো, ওয়াইল্ড এনিম্যাল পাসিং জোন”… “এলিফ্যান্ট করিডোর, ড্রাইভ স্লো, ডু নট অবস্ট্রাক্ট”… কোথাও গণ্ডার, কোথাও হাতি আবার কোথাও বাইসন -এর ছবি দিয়ে সাইন বোর্ড টাঙানো।

প্রকৃতিদেবী বিরূপ তাই পশুকুল মুখ ফেরালেও, পক্ষীকুল কৃপণতা করেনি আমাদের সাথে। তাদের সান্নিধ্য রসদ জুগিয়েছে গোটা দিনের। ক্যামেরা তাক করা ছিলই, গতির সাথে সাথে খচাখচ শব্দে সে তুলে যেতে থাকল সময়ের প্রতিচ্ছবি।

A smooth straight highway through the heart of the beautiful tropical rainforest at Gorumara National Park, Lataguri, West Bengal - Abokash images

রাস্তা বাঁয়ে মোড় নিতেই গাড়ির গতি কমিয়ে সদন জানালো এই জায়গাতেই আগের সপ্তাহে দুই মোটর বাইক আরোহীকে তাড়া করেছিল এক দাঁতাল। প্রাণ বাঁচাতে বাইক ফেলেই দৌড় দিয়েছিলো লোক দুটি। হুম্-ম্! চেনা চেনা লাগল জায়গাটা, সংবাদপত্রেই বেরিয়েছিল সচিত্র খবরটা। সভয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম রাস্তার দুইপাশ।

জঙ্গলের প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় আরো একটি বাঁক। রাস্তার ঠিক পাশেই একটি গাছের নিচে বড় একটা ত্রিশূল পোঁতা। ত্রিশূলের পাশে ছোট বড় বেশ কিছু পাথর বসানো। পাথরগুলি সিঁদুর মাখা। তাদের মাঝে মাঝে, লাল রঙের পতাকা আটকানো কয়েকটি সরু বাঁশের কাঠি পোঁতা। রক্ত জবাও চড়ানো রয়েছে পাথরের মাথায়। স্থানীয় কোন পুরোহিত সবে পুজো করে গিয়েছেন বোধহয়। ধূপের ধোঁয়া মিলিয়ে যায়নি তখনও।

মহাকাল মন্দির। স্থানীয় লোকজন খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা করেন এই মন্দিরের অধিষ্ঠাতাকে। খুব জাগ্রত ইনি। জঙ্গলের শান্তি ও শৃঙ্খলা এঁরই হাতে। জঙ্গল বা লাগোয়া চা বাগানে কোনো অঘটন যাতে না ঘটে তাই এঁকে তুষ্ট করতেই এই মন্দির।

মহাকাল মন্দির ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা এগোতে জঙ্গল শেষ হয়ে এল চা বাগান। মাঝে মাঝে সোনালী ধানের ক্ষেত ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘর বাড়ি। একটু এগোতে, এসে পড়লাম বড় একটি লোকালয়ে। হাট বসেছে, ভিড় জমিয়ে মানুষজন কেনাকাটায় ব্যস্ত। কাঁচা আনাজ, শাক-সব্জি, মাছ, মুদির দ্রব্যাদি, মাটির তৈরি হাঁড়ি কলসী আরো কত কি। এদেরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চললাম মিনিট দশেক। পথ এখানে মিশেছে অন্য একটি বড় রাস্তায়। মিলেছে আলিপুরদুয়ার রোডের সাথে।

(২)

চালসা। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থানের জন্যই সারি সারি দোকান আর অনেক লোকের আনাগোনা এখানে। ট্রাফিক সামলাতে দেখা মিলল দুই জন খাকি উর্দিধারির। এখান থেকে আলিপুরদুয়ার রোড ধরে বাম দিকে এগিয়ে গেলে মাল বাজার হয়ে শিলিগুড়ি। ডান দিকে গেলে চাপড়ামারি স্যাংচুয়ারির মাঝ দিয়ে যাওয়া যাবে নাগরাকাটা। যে রাস্তা পার করে এলাম সেটি ধরে গেলে গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক পার করে লাটাগুড়ি হয়ে যাওয়া যাবে ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ি। আর অন্যটি দিয়ে সামনে উঠে গেলে যাওয়া যাবে সামসিং হয়ে বিন্দু।

গাড়ি থেকেই চোখে পড়ছিল পাহাড়ের চূড়ার অস্পষ্ট অবয়ব। সমতলের লোকেদের কাছে কোনো একটু উঁচু স্থানই পাহাড়। তাই আমাদের মন আনচান করে উঠল শিখর ছোঁয়ার। অনেকটা পথ পাড়ি দেবে তাই গাড়ি থামল তার খিদে মেটাবার জন্য। আমারও গাড়ি থেকে নেমে কিছু শুকনো খাবার কিনে নিলাম। পথে কোথায় কি পাওয়া যায় তার কি কোনো ঠিক আছে?

চালসা ক্রসিং পেরিয়ে একটু এগোতেই রাস্তা ডাইনে বেঁকে উঠে গিয়েছে উপরে। গাড়িতে বসে চড়াই উঠতে কষ্ট হচ্ছিলো না ঠিকই তবু চোখে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখতে সাহস হচ্ছিল না, পাছে উল্টে পড়ি। সামান্য চড়াই উঠেই আবার কিছুটা সমতল। গাড়ি আবার তার গতি বাড়াল। পথের দুই ধারে যেদিকে চোখ যায় শুধুই চা বাগান। ঘন পাতায় আঁটোসাঁটো হয়ে থরে থরে দাঁড়িয়ে কোমর সমান চা গাছ। আর তাদের মাঝে মাঝে কিছু বড় বড় বাবলা, শিরিষ, কদম, আরও নাম না জানা অনেক ছায়াতরু। ছোট বড় পাহাড়ের ধাপে ধাপে সারি সারি চা গাছ আর তার ভেতর দিয়ে আঁকা বাঁকা কালো পিচের রাস্তা চলে গিয়েছে দূরে।

Foggy-tea-garden-with-fantastic-view-in-Darjeeling-district-of-Benga l- Abokash Images

রাস্তাতে তখন সবে ঢেউয়ের ছোঁয়া লেগেছে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আমরা। হঠাৎ গাড়ি থামল। বলাই বাহুল্য, নেমে যেতে সময় লাগল না একটুও। এক ছুট্টে হারিয়ে গেলাম সকলে। সবুজের আলিঙ্গনে আমরা তখন আত্মহারা। বিরামহীনভাবে ক্যামেরা তার কাজ করে যাচ্ছিল। প্রবল নিপুণতায় প্রকৃতির ‘ডিটেল’ গুলিকে ফুটিয়ে তুলতে সে তখন ব্যস্ত।

উপরদিকের পাতা লিকলিকে কচি কলাপাতার রঙের আর নিচের দিকে রং গাঢ় সবুজ। কালচে রঙের কান্ডগুলি বেশ পোক্ত। এদের বয়স পাঁচ-কুড়ি পার করেছে বোধহয়। কিছুটা ছাড়া – ছাড়া মাঝারি উচ্চতার গাছ। প্রখর রোদ্দুর থেকে এদের বাঁচানোর জন্য পোঁতা। বৃষ্টির জল যাতে না আটকায় তাই নুড়ি পাথরের পাহাড়ি ঢালের ধাপে ধাপে বসানো গাছগুলি।

কাছে পিঠেই চলল আমাদের নিরীক্ষণ পর্ব। বাগানের গভীরে যাওয়া মানা। চিতার/লেপার্ডের বিশেষ পছন্দের জায়গা এটি, বাচ্চা দেবার সময় এরা চা বাগানের মাঝে আস্তানা গাড়ে। জংলী শূকর, গবাদি পশু, মায় মানুষ ও এদের খাদ্য তালিকার প্রথম সারিতে থাকে। কে জানে, আসে পাশে কোনো মা তার বাচ্ছা পাহারা দিচ্ছে কিনা?

চা বাগানে আরও কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার চড়ে বসলাম গাড়িতে। কিছু কাঁচা পাতা চলল আমাদের সাথে, স্মৃতি স্বরূপ। একটু এগোতেই রাস্তার ধরে মাইলস্টোন। লেখা: সামসিং ৫ কিমি..

A wavy pathway between a tea garden at Samsing - Kumai - Rupashi Bangla - Abakash images

(৩)

ঘন জঙ্গল বেষ্টিত নেওড়া ভ্যালির পাদদেশে যেখানে গিরিরাজ হিমালয় এসে মিশেছে সমতলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ৩০০০ ফুট উচ্চে অবস্থিত সামসিং। এর ভূচিত্র ছোট-বড় পাহাড় ও পাহাড়ি নদী, চা বাগান এবং জঙ্গল পরিবেষ্টিত। নৈসর্গিক এই শোভাই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের সম্মোহিত করে কাছে টেনে নিয়ে আসে বারবার। দুই ভাগে বিভক্ত এই অঞ্চলের এক অংশ জলপাইগুড়ি জেলা ও অন্য অংশ কালিংপঙ জেলার মধ্যে অবস্থিত। স্থানীয় মানুষজন মূলত চা, পর্যটন ও কাষ্ঠশিল্পের সাথে যুক্ত। ব্রিটিশ আমলের বাগানগুলি এখনও এই অধিবাসীদের আহার জুগিয়ে চলেছে অবিরত।

পথ তার চরিত্র বদলাতে থাকল দ্রুত। পাশের চা বাগানগুলি আরও একটু উঁচু-নিচু হয়ে আমাদের সাথে পা মেলাল। এতে বাগানগুলির শোভা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আঁকা বাঁকা পথে আরও কিছুটা এগোতেই ছোট একটা জনপদ। কার যেন একটা স্ট্যাচু বসানো রাস্তার মাঝে। সেটি রাস্তাটিকে ভাগ করে দিয়েছে দু-ভাগে। আশেপাশে কিছু দোকানপাট ও ছোট বড় কাঠের ঘর বাড়ি। সামনে বেশ কিছু স্থানীয় লোকের জটলা, উৎসুক দৃষ্টি আমাদের দিকে ফেরানো। সব মুখগুলি যেন একইরকমের। আলাদা করে চিনে নিতে কষ্ট হয়।

সামসিং -এর এই জনপদটি ছাড়াতেই রাস্তার অবস্থা বেহাল। গাড়ি চলতে থাকল গতি কমিয়ে। রাস্তার এক পাশে জঙ্গল ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে নিচে আর অন্য পাশে কিছুটা ছাড়া ছাড়া ছোট ছোট বসত বাড়ি। ইঁটের গাঁথুনির পাকা দেওয়াল দেওয়া বাড়িগুলির ছাউনি টিনের, কোনোটায় লাল কোনোটায় সবুজ রঙ করা। বাড়ির উঠানে বসে কোলের শিশুরা খেলা করছে বাড়ির বয়স্কদের সাথে।

রাস্তা থেকে খানিক দূরে একটি প্রাইমারি স্কুল। স্কুলের এক চিলতে মাঠে দৌড়ে বেড়াচ্ছে লাল সোয়েটার পরা কিছু খুদে ছেলেমেয়ে। এখান থেকে রাস্তার ঢাল সোজা উঠে গিয়েছে ওপরে। সরু রাস্তার দুইধারে ঝাউ, দেবদারু, মেহগিনি, অর্জুন, জাম, কমলালেবুর হালকা-ঘন চিরহরিৎ জঙ্গল। বেলা বাড়লেও সূর্যের তেজ এখানে স্তিমিত। সোনালী রং তখনও হলদে হয়নি। কিছুটা উঁচুতে কুয়াশায় ঢেকে রেখেছে পাহাড়ের চূড়া। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা হওয়ার ঝাপটা লাগছিল চোখে মুখে। সে অনুভূতি অনন্য।

Fresh aroma of a wet tea garden of Bengal-Samsing - Abakash images

(৪)

সানতালেখোলা। ঝকঝকে নীল আকাশ ও চকচকে সবুজাবৃত পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ডুয়ার্সের এই স্বল্পপরিচিত স্থানটি চমৎকার একটি ট্যুরিস্ট স্পট। রাত্রিবাস করার জন্য এখানে আধুনিক সমস্ত সুবিধাযুক্ত বাংলো টাইপের দু-তিনটি বাড়ি এবং স্থানীয় মানুষদের ব্যবস্থাপনায় কিছু হোম স্টেও বিদ্যমান। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটি বনবাংলোতেও রাত কাটানো যায় নিভৃতে। শান্ত নির্ঝঞ্ঝাট নিরিবিলি এই জায়গায় সর্বক্ষণের সঙ্গী নাম না জানা পাখির দল ও ছোট্ট নদী মূর্তি।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অনেকটা চড়াই পথ পেরিয়ে সদন তার বাহন থামাল। দশ-বারোটি বসতবাড়ি, লাগোয়া দোকান। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সাজিয়ে রেখে বিক্রিবাটায় ব্যস্ত বাড়ির মালিক ও মালকিনরা। মূলত পর্যটকদের ওপর নির্ভর করেই চলে এই ব্যবসা। প্রত্যেকটি বাড়ির উঠোনে বা পাশের ফাঁকা জায়গায় ফুলের বাগান। রং-বেরঙের বাহারি ফুলের মেলা গাছে গাছে। বৈচিত্রে ভরা রঙের মেলায় সামিল লাল, সাদা, গোলাপি, হলুদ, বেগুনি ও আরো অনেকে। সবুজের মাঝে, মৃদু হাওয়ায় মাথা দুলিয়ে প্রত্যেকেই জানান দিচ্ছিল তাদের নিজেদের স্বতন্ত্রতা।

বছরের অনেকটা সময় বৃষ্টিপাত হয় এখানে। তাই চাষবাসের সুযোগ সুবিধা রয়েছে। পাহাড়ি ঢালে ধাপ কেটে চাষ হয়েছে ধান, স্কোয়াশ, আদা, কচু এবং আরো কিছু রবি ফসল। এখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার নেমে গেলে সুনতালেখোলার দ্রষ্টব্য স্থানটি। হাতে সময় কম, তাই গাড়ি নিয়ে ছায়াঘেরা অন্ধকারময় আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে নিচে নামতে হল।

মিনিট দশেক নামার পর আমরা যেখানে পৌছালাম সেটি এককথায় অসাধারণ। তার রূপ বর্ণনাতীত। পাহাড়ের গা ধুয়ে গড়িয়ে চলে গিয়েছে ছোট্ট নদী মূর্তি। তার গতিপথ রুদ্ধ করতে জটলা পাকিয়েছে ছোট বড়ো নুড়ি পাথর। কোথাও ঝমঝমিয়ে আবার কোথাও কলকলিয়ে স্মিত শুভ্র হেসে সে এগিয়ে চলেছে অবিরল। তার সরু ধারার চারিধারে পাহাড় ভেঙে গড়িয়ে আসা বড় বড় পাথরের চাঁই। চাঁইগুলির ঠিক পিছনেই ঘন জঙ্গল। লতায় পাতায় মোড়া সে জঙ্গল উঠে গিয়েছে পাহাড়ের ওপরে যতদূর চোখ যায়। ক্ষীণ স্বচ্ছ ধারা পাথরে ধাক্কা খেয়ে কুলকুল শব্দে বয়ে যাচ্ছিল পায়ের সামনে দিয়ে। ভীষণ ঠান্ডা তার জল। পা দিলে শিহরণ জাগে শরীরে।

Suntaley river flowing on the rocky terrain on a bright morning at Suntaley Khola - Abokash images

নদীর ওপরে একটি ঝুলন্ত সেতু। এক পাড়ের সাথে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে অন্য পাড়টিকে। সেতুর মাথায় সাইনবোর্ডে লেখা: সুনতালেখোলা রিসর্টে স্বাগতম। কাঠের পাটাতনবেষ্টিত সেতুটির দুইধার শক্ত লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। লোহার মোটা দড়ি দিয়ে সেতুটিকে ঝোলানো রয়েছে মূর্তি নদীর ওপর। এক সঙ্গে ৫ জনের বেশি ওঠা মানা।

সেতুটি পার হয়ে রাস্তা গিয়েছে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘন জঙ্গলের পাশ দিয়ে। সেটি ধরে একটু এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে বেঁকে গেলেই যাত্রাপথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের রিসর্টের লোহার গেট। উল্টোদিক থেকে ফেরার পথের দৃশ্যপট অতি মনোরম। বামদিকের উঁচু পাহাড় থেকে ঢাল বেয়ে নেমে এসেছে ঘন জঙ্গল। ছোট-বড় লতাপাতাবেষ্টিত নিবিড় জঙ্গলের মাঝে মাঝে ঝাউ, মেহগিনি, কমলালেবু ও অর্জুনের মেলা। রাস্তার ডানদিক দিয়ে পাথুরে পথে বয়ে গিয়েছে মূর্তি।

একটি পায়ে হাঁটা পথ মিশে গিয়েছে মূর্তির সাথে। সেই পথ দিয়ে নেমে গেলাম নিচে। খানিকটা সময় কাটলো নুড়ির ওপর বসে। ঝিঁঝিঁ, পাখির কিচিরমিচির আর মূর্তির কুলকুল শব্দের কোরাস এর সাথে, জঙ্গলের শোভা দেখতে দেখতে…

এবার ফেরার পালা। আবার সেই ছায়াপথ মাড়িয়ে চড়াই উঠতে হল। জঙ্গলবেষ্টিত পথের দুইধারে মাঝে মধ্যেই টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট কাঠের বাড়ীগুলি যেন হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানাচ্ছিল। প্রকৃতির নিবিড় মায়াবন্ধন কাটিয়ে আমরা পা বাড়ালাম আমাদের তৃতীয় গন্তব্যের দিকে।

 

(ক্রমশ)

A little river flowing between rocky path at Suntaley Khola - Abokash images
আমাদের প্যাকেজ ট্যুর

Leave a Reply

Proceed Booking