শিখর ছোঁয়ার নেশায় – ২

Abokash > Blog > শিখর ছোঁয়ার নেশায় – ২

(৫)

ছোটখাটো সুগঠিত শরীরের সাথে তুলনামূলক বড় মাথা, ভাসা ভাসা চোখ, কাঁচাপাকা চুল, কপালে কঠোর পরিশ্রম আর বয়সের বলিরেখা। গায়ে গোলগলা কমলা টি-শার্ট আর বহুদিনের জীর্ণ ধূসর একটা ওভারকোট। সর্বাঙ্গীন হাসিখুশি মুখাবয়বের একটি মানুষ কপালে হাত ঠেকিয়ে কুর্নিশ জানাল। কারণ অজানা! হয়তো সবাইকেই জানান তাঁর এই কুর্নিশ… এই সহজ সরল মনোভাব আর হাসিখুশি প্রায় একইরকমের মুখগুলি আজ এতো দিন পরেও টেনে নিয়ে যেতে চায় তাদের কাছে।

আবার শুরু পথচলা। গোধূলিময় কুয়াশাঘেরা বন্য পাহাড়ী পথ দিয়ে নেমে এলাম সামসিং-এ। সেই অচেনা অজানা মুখগুলি তখনও একইভাবে আমাদের জরিপে ব্যস্ত। বাঁয়ে মোড় নিয়ে গাড়ি গ্রামের ভেতর দিয়ে চলতে শুরু করল। রাস্তার দুই পাশে ছোট বড় নানান রঙের বাগান ঘেরা ঘরবাড়ি। কোনটা কাঠের আবার কোনটির দেওয়াল পাকা। ঢালাই ছাদের বাড়ি খুব কমই চোখে পড়ল, প্রায় সব বাড়িরই টিনের চাল, যেগুলিতে আবার বাদামি রঙ ধরেছে।

বাহারি পোশাকের মানুষজন গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত। কাঠের বাড়িগুলির চালের ওপর তখন সাদা ধোঁয়ার কুন্ডলী। বাড়ির পাশের একচিলতে খেত থেকে শাক তুলছে একজন। নাইলনের দড়িতে জামাকাপড় শুকোতে দিচ্ছে কেউ কেউ। পাশের দোকান থেকে হাতে লবণ ও আরো কিছুএকটা নিয়ে বাড়ি ফিরছে একটি বাচ্চা মেয়ে। ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুএক জন। একটু দূরে সার সার সুপুরি বাগানে চরে বেড়াচ্ছে বানরের দল। গাড়ির শব্দে চকিতে ঘুরে তাকাল একবার। পাশের বাগানে সুপুরি কুড়োচ্ছেন বয়স্ক একজন। খানিকটা এগোতে সুপুরি বাগানের শেষে এল চা বাগান।

রাস্তা এখানে সুনসান। পাশ দিয়ে নিঃশব্দে বয়ে চলেছে মূর্তি। যদিও এখানে কিছুটা চওড়া সে, তবুও তার ধারা ক্ষীণ। প্রায় চোখেই পড়ে না। নদীর ওপারের দূরে কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের হালকা অবয়ব। আরও খানিকটা পাড়ি দিতে হল জনমানবহীন এই প্রান্তরের মধ্য দিয়ে। রাস্তা বাঁয়ে ঘুরতেই সরু একটি সেতু। মূর্তিকে পারাপার করার জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে কংক্রিটের একফালি ব্রিজটি।

ব্রিজের পরের রাস্তা হাড় জিরজিরে নুড়ি পাথর বেরানো। ঠোক্কর খেতে খেতে এগোতে হচ্ছিল। জংলী ঝোপে ঘেরা জীর্ণ ঢালু রাস্তা বেয়ে ওপরে উঠতে সময় লাগল বেশ কিছুটা। পথের ধারে গল্পে মশগুল স্কুলছুট দুই দস্যি সন্তর্পণে তাকাল আমাদের দিকে। যেন তাদের কান্ডকারখানা কিছুটা অযাচিত ভাবেই চলে এসেছে আমাদের গোচরে।

আরও একটু এগিয়ে রাস্তা মুড়ল ডানদিকে। ঘন সবুজ বাগানগুলি যেন আবার আমাদের আপন করে নিল তার দুই বাহু প্রসারিত করে। এত পথ পাড়ি দিয়েও বাগান থেকে চা পাতা তুলতে দেখিনি কাউকে। হয়তো নরম কচি পাতা তোলা হয়েছে দিন কতক আগেই। কিন্তু আমাদের সেই আশাও এবার পূর্ণ করল ‘কুমানি টি এস্টেট’। গাড়ি থামিয়ে নেমে গেলাম প্রবল উৎসাহে। ক্যামেরা তাকে করে সবে ক্লিক করতে যাবো এমন সময়, “পিকচার মত্ তোলিয়ে”। গম্ভীর গলার শব্দে থামতে হল। মুখ তুলে দেখি একটু দূরে বয়স্ক একজন হাত নেড়ে ছবি তুলতে মানা করছে আমাদের। “পিকচার মত্ তোলিয়ে সাব” আবার বলল লোকটি। অগত্যা, তাকে আশ্বস্ত করে গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম।

সরু একফালি মসৃণ কালো পিচের দুই ধারে সার সার ঘন চা বাগান আর তার থেকে কচি পাতা তোলায় ব্যস্ত অসংখ্য মানুষ। যে দিকে চোখ যায় একই দৃশ্য। মেয়েরা বোধহয় ছেলেদের থেকে পটু এই কাজে, তাই বেশি চোখে পড়ল তাদেরই আধিক্য। রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে তাদের কাজ তদারকিতে ব্যস্ত ছাতা মাথায় সুপারভাইজার গোছের একজন। সাদা শার্ট আর নীল স্কার্ট পরিহিতা কিছু মেয়ের দল বাড়ি ফেরায় ব্যস্ত স্কুল থেকে। তাদের পাশ কাটিয়ে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। বাগান পেরিয়ে আবার প্রবেশ করলাম একটি পাহাড়ি গ্রামে।

সুপুরি গাছে মোড়া সেই গ্রাম। মাটি থেকে প্রায় কোমর সমান উঁচুতে বসানো বাদামি টিনের চাল দেওয়া কাঠের বাড়িগুলি ঘেরা সুপারি, আম, পেয়ারা, কলা প্রভৃতি গাছে। পাশের ফাঁকা জমিতে চাষ হয়েছে লাউ, কুমড়ো, স্কোয়াশ…

অভিন্ন আরও কিছু গ্রাম পেরিয়ে গাড়ি ছুটে চলতে থাকল তার আপন মনে। কখনো উঠছি আবার কখনো নেমে চলেছি ঢাল বেয়ে। ছোট্ট একটা নদীর ওপর লোহার একটি সেতু। সেটি পেরোতেই আমূল পরিবর্তন হতে থাকল ভূমির চরিত্রের। উপত্যকা বেয়ে কখন যেন পৌঁছে গেছি সুউচ্চ পর্বতের পাদদেশে। ঘাড় উঁচিয়েও গোচরে এল না তার শিখর। বনভূমির বৈশিষ্ট এখানে লক্ষণীয়। বড় বড় বাঁশের ঝাড় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আর তাদের সহচর শিরিষ, আম, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, চাকুন্দা, করঞ্চি। বনানী এখানে অবিকল সমতলের মত।

Local women are collecting tea leaves from the tea tree at Samsing tea estate - Abokash images

(৬)

বেলা বাড়লেও সূর্যের আলো তখনও ফিকে। ধূসর কুয়াশা ম্লান করে রেখেছে সূর্যের তেজ। কিছুটা চড়াই উঠে গাড়ি থামল একটা রেস্তোরাঁর সামনে বেলা প্রায় দেড়টা, সময় হয়েছে মধ্যাহ্নভোজের…

জলঢাকা পিকনিক স্পটের ঠিক ওপরেই একেবারে খাদের ধারের রেস্তোরাঁটির খাবার মোটের ওপর ভালোই। সরষে শাক ভাজা, বিউলির ডাল, দুই রকমের সবজি, স্যালাড ও ডিমের কারি সমন্বেয়ে সরু চালের ভাত। সুস্বাদু না হলেও বিস্বাদও নয়। বিল মিটিয়ে যখন সবাই গাড়িতে উঠলাম তখন ঘড়িতে ২:৩০।

সরু রাস্তার বাম দিকে ঘন জঙ্গলে মোড়া উঁচু খাড়াই পাহাড় আর ডান দিকে গভীর খাদ মিশে গিয়েছে জলঢাকায়। নুড়ি পাথরে ভরা জলঢাকা ছুটে চলেছে এঁকে বেঁকে লাফিয়ে লাফিয়ে। নদীর অন্য পারই ভুটান। এক নদী দূরে, চোখের সামনেই ফারাকবিহীন একটি ভিনদেশ। নেই কোন কাঁটাতার, নেই কোন প্রহরী। সুস্থ সম্পর্কের এই নিদারুণ দৃষ্টান্ত চাক্ষুষ না করলে বিশ্বাসই করা যায় না।

গাড়ি চলছিল তার নিজের গতিতে। রাস্তার প্রতি বাঁকেই ছ্যাঁৎ করে উঠছিল বুকটা। এই বুঝি উল্টোদিকের কোন গাড়ি সামনে এসে পড়ে। মাঝে মাঝে ঝমঝম শব্দে পাহাড়ি ঝর্ণা বয়ে গিয়েছে রাস্তার ওপর দিয়েই। কোথাও আবার পাথরের চাঁই গড়িয়ে এসে পড়ে আছে পথের ধারে। তাদের পাশ কাটিয়ে সদন তার কাজ করে যাচ্ছিল পোক্ত হাতে। দুরুদুরু বুকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ বেয়ে এগোচ্ছিলাম গন্তব্যের দিকে। পথে ধারে ছোট ছোট বাড়ি, আর তার উঠোনে বসে গল্পে মশগুল মহিলারা মুখ তুলে দেখছিলেন আমাদের।

আরও কিছুটা এগিয়ে গাড়ি থামল লোহার রেলিংঘেরা একটি জায়গায়। জলঢাকা পাওয়ার প্লান্ট। গাড়ি থেকে নেমে, রেলিং এর সামনে এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিতেই মাথা ঘুরে যাবার জোগাড়। বড় এক পাথরে ধাক্কা খেয়ে গর্জন করতে করতে প্রায় ৩০০ ফুট নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জলঢাকা। স্বচ্ছ জলের নিচের নুড়ি পাথর দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট । নদীর অন্যপাড়ে বিশাল উঁচু পাহাড়ের দেওয়াল উঠে গিয়েছে অনেক ওপরে। সেই অংশ ছেয়ে রয়েছে কুয়াশাবৃত ধূসর সবুজ অরণ্যে। নিচের দিকের কিছুটা অংশ ধসে পড়েছে নদীতে। প্রকৃতির এই বিশাল কর্মকাণ্ডে উপলব্ধি হচ্ছিল নিজের ক্ষুদ্রতা। কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার শুরু পথ চলা।

পাহাড়ি গ্রামের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে, মাঝে মধ্যেই গতি শ্লথ হচ্ছিল আমাদের। অন্য গাড়িকে পাশ দেওয়া ছাড়াও পথের কোনো কোনো অংশ মেরামতির জন্য। প্রায় মিনিট পনেরো চলার পর পৌঁছলাম আমাদের সেই প্রতীক্ষিত গন্তব্যে..

Jaldhaka River flows over the rocky terrain in between Indian and Bhutan hill at Jaldhaka Hydro Power plant - Kalimpong - Abokash images

(৭) 

বিন্দু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ২০০০ ফুট উঁচুতে পাহাড়ি উপত্যকায়, ইন্দো-ভুটান সীমান্তে অবস্থিত ছোট্ট একটি গ্রাম। ভারত ও ভুটানের যৌথ পরিচালনায় গঠিত প্রাচীনতম ইলেক্ট্রো-হাইড্রো প্রকল্প ‘বিন্দু ড্যাম’। সেটি ছাড়াও এই গ্রাম বিখ্যাত এলাচ চাষের জন্য। সীমান্তবর্তী এলাকা বলেই এখানে একটি সেনা ছাউনি বর্তমান। যদিও স্থানীয় মানুষরা এপার ওপারে আসা যাওয়া করেন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বেচাকেনার জন্য। তবে বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া পর্যটকদের বিন্দু ড্যাম দেখার সুযোগ মেলে না।

নীল আকাশ, ঘন সবুজ বনানী বিস্তৃত পাহাড়ের উঁচু নিচু চূড়া। কুলকুল শব্দে জলঢাকার বয়ে যাওয়া আর হাতের নাগালে ভিনদেশ ভুটান। পাহাড়ের কোলে মিতভাষী মানুষগুলির সাহচর্যে এবং পাথুরে টিলার ওপর বসে জলঢাকার জলে পা ডুবিয়ে প্রকৃতিকে উপলব্ধি করতে করতে অনায়াসেই কাটিয়ে দেওয়া যায় কয়েকটা দিন। কিছু হোমস্টে ছাড়াও এখানে কিছু ছোট হোটেল আছে রাত্রিবাসের জন্য।

গাড়ি থেকে নেমে বিন্দুর ট্যুরিস্ট স্পটে পৌঁছতে সচিত্র পরিচয়পত্র দেখাতে হল ভারতীয় সেনা জওয়ানকে। সামনে, পথের বাম দিকে ছোট্ট একটি অন্ধকার গুহা। উঁকি দিতে ভেতরে শিবলিঙ্গ চোখে পড়ল। অজান্তেই হাত নিজের কপাল ছুঁয়ে প্রণাম জানাল মন্দিরের অধিষ্ঠাতাকে।

Nice view of Bindu dam on Jaldhaka river at Indo-Bhutan border-Kalimpong - Abokash images

ধূসর, কালো, সাদা, বাদামি, খয়েরি রঙের ছোট বড় নুড়ি পাথরে বিছানো পথের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে শ্বেতশুভ্র জলরাশি। বরফের মতো ভীষণ ঠান্ডা সেই জলে পা দিতেই ঝট্কা লাগলো শরীরে। তবুও সে অনুভূতি বর্ণনাতীত। অনতিদূরে পাঁচ গেটবিশিষ্ট জলঢাকা ব্যারেজ। গোলাপি রং করা কংক্রিটের থামের মাঝে বড় বড় পাল্লা দেওয়া লোহার গেট। ভয় হল এই বুঝি কেউ সেগুলি তুলে নেয়।

পাশে বড় একটি বাদামী টিলা। টিলাটির ওপর বসে কিছু লোকজন। আমরা গিয়ে পড়লাম সেখানে। দখলমুক্ত করতে বেশি সময় লাগল না জায়গাটা। আডভেঞ্চারের নেশা চেপে ধরেছে তখন। টিলার মাথায় চড়তেই হবে। ওইটুকু সময়েই যেন ফিরে গেছি শৈশবে। খানিক চেষ্টায়, শিখর জয়ের আনন্দ। হোক না সেটা অনুচ্চ টিলা, তবুতো সেটা মানুষ তিনেক উঁচু। ওটাই শিখর আমাদের কাছে। টিলা থেকে নেমে এদিক ওদিক কিছু খোঁজার চেষ্টাও হল… কিসের? তা জানিনা নিজেও। নুড়ির ওপর নুড়ি সাজিয়ে চলল নূতন কিছু বানানোর খেলাও।

বেলা পড়ে আসছিল তাই ফেরার তাগিদ অনুভব করতে হল কিছুক্ষন পরই। ভারাক্রান্ত মনে ফিরে চললাম একরাশ স্মৃতি নিয়ে। পাড়ে পৌঁছে পিছন ফিরে দেখি আমাদের জায়গার নূতন অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত টিলাটি। হাসলাম মনে মনে! এটাই তো জীবন, থেমে থাকেনা সে কারও জন্যে, এগিয়ে চলে তার নিজের ছন্দে…

সারাদিনের অনেক জার্নিতে ক্লান্ত লাগছিল এবার, তাই পাশের হোটেলে চা খেতে বসলাম সকলে। সেখানে আলাপ হল এক সীমান্তরক্ষীর সাথে। আমরা মেদিনীপুরের লোক শুনে আলাপ জুড়ে দিলেন খোসমেজাজে। জানালেন, বীরভূমের মানুষ হলেও প্রায় ৬ বছর কাটিয়েছেন মেদিনীপুরের শালবনির জঙ্গলে। এখন এই বিন্দুতে; তাও সেই ২০১৩ থেকে। গল্প সংযোগে চা পর্ব মিটতে প্রায় সাড়ে চারটা। বিদায় জানিয়ে, গাড়িতে চড়ে বসলাম সকলে। ফিরতে হবে লাটাগুড়ি, তা প্রায় ঘন্টা দেড়েকের পথ।

A beautiful landscape of Indian and Bhutan hill divided by Jaldhaka river at Bindu-WB-Kalimpong - Abokash images

(৮)

পাহাড়ে সন্ধে নামে ঝুপ করে, সাড়ে চারটাতেই কেমন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। ছুটছি এবার উল্টো পথে। মেঘের ফাঁক গলে পড়ন্ত বেলার একফালি রোদ এসে পড়েছে পাশের ক্ষেতে। পাহাড়ের ধাপ কেটে কেটে ধান চাষ করা হয়েছে সেখানে। পথের ধারের মানুষজনের পায়ে তখন বাড়ি ফেরার তাড়া। পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে খাদের ধারের রেলিং-এ দাঁড়িয়ে দুটো মেয়ে। তাদের পার করে ফিরতে থাকলাম দ্রুত। দিনের আলো প্রায় ফুরিয়েই এসেছে এখানে।

পাহাড় থেকে নেমে যখন কুমানি পৌঁছাল গাড়ি, তখনও এখানে বেশ কিছুটা আলো। চা বাগানের পাশ দিয়ে চলতে চলতে, গাড়ি থেমে গেল চুপিসারে। ইশারায়, বাগানের পাশের ঝোপের দিকে তাকাতে বলল সদন। বড় একটা ময়ূর খুঁটে খুঁটে কিছু খেতে ব্যস্ত। কোনো শব্দ না করেই গাড়ি থেকে নামলাম ভাল ছবি নেওয়ার জন্য। হঠাৎ সে ডানা মেলে উড়ে গিয়ে বসল দূরের একটা গাছে। ছবি না নেওয়া গেলেও মনে গেঁথে রইল ময়ূরের ওড়ার দৃশ্যটি।

কুমানি ছাড়িয়ে চাপরামারি ফরেস্টের সরু রাস্তা দিয়ে ছুটে চলল গাড়ি। এখানেও দিনের আলো ফুরিয়ে আসছিল দ্রুত। বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল বনের গভীরে। বন্য প্রাণীরা তো এই বিকেলেই ঘরে ফেরে, যদি দেখা মেলে একবার। এই বুঝি, হাতির পাল মড়মড়িয়ে গাছ ভাঙতে ভাঙতে পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পথ আটকে দাঁড়ায়! অথবা বাইসন তাড়া করে তাদের তীক্ষ্ন শিং উঁচিয়ে! নিদেনপক্ষে যদি দেখা মেলে একটা শেয়ালেরও।

A lovely view of Murti river bridge covered with jungles of dooars-Gorumara National Park and Chapramati forest-North Bengal Tours - Abokash images

মনের আশাটা শঙ্কায় পরিণত হতে বেশি সময় লাগল না, উল্টোদিকের একটা গাড়িকে দ্রুতগতিতে আমাদের দিকে আসতে দেখে। হুস করে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার পর ঘোর কাটল… ধুস! কোথায় কি? কেউ তো তাড়া করেনি তাকে… আমাদের ভাগ্যই খারাপ আজ।

বেশ কিছুটা চলার পর জঙ্গল শেষ হয়ে পথ এল সরু লম্বা একটা সেতুর ওপর। সেটা পর হয়ে গাড়ি আবার দাঁড়াল। ট্যুরিস্ট স্পট মূর্তি।

মূর্তির যে ধারাকে সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি দিনের অনেকটা সময়, এটি মোটেও সেই পরিচিত সরু ধারা নয়। নদী বেশ কিছুটা চওড়া এখানে। জঙ্গলের পিছন থেকে চাঁদ উঁকি মারছে তখন। জোৎস্না আলোয় ঝলমল করে উঠছে তার জল। চওড়া ধারা পেরিয়ে জ্যোৎস্নাস্নাত ধূসর বালি ও নুড়ি চলে গিয়েছে অনেকটা। তারও পিছনে নিবিড় কালো জঙ্গল। মিশমিশে কালো জঙ্গল যেন লকলকে জিভ বেরকরে ওঁৎ পেতে বসে আছে আজকের প্রথম শিকারের অপেক্ষায়।

চড়া পেরিয়ে নদীর জল ছোঁবার সাহস না হলেও, ব্রিজের ওপর দিয়েই কিছুটা হেঁটে এগিয়ে চললাম। প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছি। হঠাৎ অচেনা এক পাখির কর্কশ শব্দে হাঁটার ছন্দপতন ঘটল। আর তার প্রায় সাথে সাথেই জঙ্গলের ভেতর থেকে রাত্রের নিস্তব্ধতাকে ফালা ফালা করে ডেকে উঠল ময়ূরের দল।

 

 

(ক্রমশ)

Stone architecture - Playing with rock at Jaldhaka riverbed Bindu-WB-Kalimpong - Abokash images
আমাদের প্যাকেজ ট্যুর

Leave a Reply

Proceed Booking