(৯)
গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক ও চাপরামারি ফরেস্টকে চরিত্রগত এবং পরিসীমাগত ভাগে ভাগ করে রেখেছে মূর্তির স্বচ্ছ ধারা। লাটাগুড়ি থেকে ৩১ নং রাজ্য সড়ক ধরে অভয়ারণ্যটিকে লম্বালম্বি পার করে মিনিট দশেক এগিয়ে গেলে আসবে বাটাবাড়ি। বাটাবাড়ি মোড় থেকে ডানদিকে উত্তর ধূপঝোরা রোড ধরে বাজার ছাড়িয়ে একটু এগোলেই চাপরামারি ফরেস্টে ঢোকার প্রবেশদ্বার মূর্তির এই জনপ্রিয় স্পটটি।
জঙ্গলের উল্টোপাড়ে মূর্তি নদী লাগোয়া পর পর রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের একটি বাংলো ও কিছু কটেজ এবং ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের দুটি সুবিশাল রিসর্ট। এছাড়াও বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক সুবিধাযুক্ত ছোট বড় অনেক রিসর্ট ও লজ রয়েছে অবকাশের জন্য। শান্ত স্নিগ্ধ এই জায়গায়, প্রকৃতির আলিঙ্গণে অনায়াসেই কাটিয়ে দেওয়া যায় অবসরের দু-একটা দিন। রিসর্টের বারান্দায় বসে জোৎস্না রাতে অনতিদূরের জঙ্গলে পশুদের জলখাওয়ার দৃশ্য অতি রোমাঞ্চকর। হরেক রকমের পাখির ভোরের আজানে ঘুম থেকে উঠে, পাশের বাগানের টাটকা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কুয়াশাবৃত জঙ্গলের দৃশ্য সত্যিই অবর্ণনীয়। প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের জন্য আদর্শ ডুয়ার্সের অতিপরিচিত এই স্পটটি।
মূর্তি থেকে যখন ফিরলাম, ঘড়িতে তখন সন্ধে সাড়ে সাতটা। ফ্রেশ হয়ে, চা পান করে, সারাদিনের ক্লান্তি সরিয়ে শরীরকে একটু চাঙ্গা করা হল। এরপর সকলে মিলে বেরুলাম গরুমারা দ্বিতীয় টিকিট কাউন্টার সংলগ্ন বাজারে ঘুরতে। বেশ কিছু রিসর্ট এবং কাঠের তৈরী ঘর সাজানোর দোকানবাড়ি। স্থানীয় লোকজন ও কিছু ট্যুরিস্টদের জটলা এখানে ওখানে। দূর থেকে ভেসে আসছিল ধামসা মাদলের আওয়াজ, সাথে আদিবাসী গানের সুর। এখান থেকে দুটো পথ চলে গিয়েছে আপ্পু ভ্যালি টি এস্টেট ও রাজাডাঙ্গা-মালবাজারের দিকে। ত্রিবেণী এই স্থানটির পরিচিতি নেওড়া মোড় বাস স্টপ হিসেবে। ইতস্তত কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা ও টুকিটাকি কেনাকাটি করে ফিরে এলাম রিসর্টে।
আগামী কালের প্ল্যানটা বেশ বড় তাই তাড়াতাড়ি নৈশাহার শেষ করে চলে গেলাম যে যার রুমে। সারাদিনের ক্লান্তি আবারও জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে শরীরে। গোটা একটা দিনের জমিয়ে রাখা স্মৃতিগুলোকে নেড়ে চেড়ে দেখতে দেখতেই কখন যেন হারিয়ে গেলাম ঘুমের দেশে…
(১০)
ভোর রাতের বৃষ্টি বেশ ঠান্ডা করে দিয়েছে পরিবেশ। তাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেও তৈরী হতে সময় লাগল কিছুটা। জঙ্গলের থমথমে মুখটাও আজ ঝলমল করছিল রোদের প্রথম আলোয়। সূয্যি মামা খোশমেজাজেই তার দ্যুতি ছড়িয়ে দিনের সূচনা করছিলেন। আমরা ছটফট করছি নুতন পথের সাক্ষী হতে। চা পান করে আমাদের বাহনের জন্য অপেক্ষা করতে হল কিছুক্ষণ। আজ পাড়ি দিতে হবে অনেক দূরে, পথও নাকি দুর্গম তাই সদন সময় নিচ্ছিল তার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে।
সকাল ৮:৩০, শুরু হল আমাদের তৃতীয় দিনের অভিযান। গরুমারার বুক চিরে আবারও ছুটে চললাম মহাকাল মন্দিরকে পিছনে ফেলে। গাড়ি থামিয়ে প্রাতরাশ সেরে, সঙ্গে শুকনো কিছু খাবার নিয়ে নেওয়া হল। চালসা মোড় থেকে বাম দিকের আলিপুরদুয়ার রোড যখন ধরলাম ঘড়ির কাঁটায় তখন ৯:৩০।
ছোট-বড় বসতবাড়ি ও গাছগাছালিতে মোড়া মসৃণ কালো পিচের রাস্তায় গাড়ি গতি বাড়িয়ে ছুটতে লাগল রেল লাইনকে সমান্তরালে রেখে। কিছুটা এগিয়ে হাড়গিলে একটি নদীর ধারাকে আড়াআড়ি পেরিয়ে পৌঁছলাম মৃতপ্রায় এক চাবাগানের মাঝে। বাদামি পাতায় মোড়া গাছগুলি শেষের অপেক্ষায় ধুঁকছে যেন। সময়ের সাথে সাথে বেমানান লাগছিল প্রকৃতির ক্রমপরিবর্তনশীল এই চেহারা। বাগান পেরিয়ে বাঁয়ে ঘুরেই বাহন থেমে গেল তার খিদে মেটাবার জন্য। মিনিট দশকের বিরতি। পেট্রল পাম্প থেকে বেরিয়ে আলিপুরদুয়ার রোড ছেড়ে ডান দিকে ঘুরে যে রাস্তায় পড়লাম সেটি বেশ সরু আর নুড়ি পাথর বেরনো। রাস্তার প্রায় ওপরেই ছোট ছোট বাড়ি করে চা শ্রমিকদের বসবাস। বস্তিটি ছাড়িয়ে নড়বড়ে পথ ধরে এগিয়ে চলতে থাকল গাড়ি।
রেল লাইন পার করে আবারও গিয়ে পড়লাম মুক্ত গালিচায়। দু চোখ যেদিকে যায় সেদিকেই অসমান ভূমিতে সারি সারি বসানো চা গাছের সমুদ্র। চওড়া ফিতে দেওয়া ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগ মাথায়, চাপাতা তোলায় ব্যস্ত মানুষজন। এখানেও নারীদের আধিক্যই চোখে পড়ল। রাস্তা চওড়া হওয়ার সাথে সাথেই গাড়িও গতি বাড়িয়ে উঁচু নিচু পথে এগিয়ে চলতে থাকল। সামনেই কিছু মানুষের জটলা; লিকলিকে সবুজ কচি পাতা বোঝাই একটি পিক-আপ ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে চা পাতা ওজনে ব্যস্ত কিছু লোক। তাদের ঘিরে ধরে সদ্য তোলা পাতা বোঝাই ব্যাগ মাথায় নিয়ে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে বেশ কিছু মহিলা, পাশ কাটিয়ে যাবার সময় ঘুরে দেখলেন আমাদের।
লাল ঝুঁটি দেওয়া কালো একটি মোরগ আমাদের আসতে দেখে এক ছুট্টে রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে পড়ল পাশের ঝোপে। দিগন্তবিস্তৃত সেই বাগানের একেবারে শেষপ্রান্তে পুরানো একটি চা প্রক্রিয়াকরণ কারখানা। তার মরচে পড়া গেটে ঝুলছে বড় বড় দুটি তালা। কারখানার ঠিক পিছনেই বেশ বড় একটি লোকালয়, মূলত চা শ্রমিকদের বসবাসের ঘরবাড়ি।
জনপদটি পার করেই রাস্তাটি মিশেছে রিশি-লাভা রোডের সাথে। চা বাগান ও জঙ্গল বেষ্টিত মিশমিশে কালো পিচের মসৃণ রাস্তাটির ধারে আরও দুটি কারখানা। এ দুটি আগেরটির চেয়ে অপেক্ষাকৃত নূতন বলেই মনে হল, যদিও এদেরও গেটে তালা ঝোলানো। দুলকিচালে চলতে থাকা তিন-চারটি মোষ আমাদের আসতে দেখেও রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে। গতি কমিয়ে সন্তর্পণে তাদের পাশ কাটিয়ে চললাম আমরা। চাবাগান ও লোকালয় পেরিয়ে পড়লাম অনতি-ঘন মাল ফরেস্টের মধ্যে। অবিরল ঝিঁঝিঁর ডাক জঙ্গলের নিস্তব্ধতাকে আরও নিবিড় করে তুলেছে যেন। জঙ্গলের সেই কোরাসের সুর মেখে এগিয়ে চললাম আমরা। পথের দুপাশের প্রকান্ড বৃক্ষগুলির কাণ্ড, লতা পাতা আর আগাছাতে মোড়া। শান্ত সেই বনভূমি যেন কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। সূর্যের সোনালী আলো, ধূসর সেই পর্দাকে সম্পূর্ণ রূপে ভেদ করতে পারেনি তখনও।
(১১)
জঙ্গল পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে, ছোট একটি শহরমত জায়গায় এসে পৌঁছালাম। গরুবাথান। অনেক মানুষের সমন্বয়ে বেশ কোলাহলপূর্ণ জায়গা এটি। বিভিন্ন রকমের দোকানপাট, বসত বাড়ি, পোস্ট অফিস, ক্লাব ও গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রশাসনিক ভবন দেখলাম সেখানে। ভিড় সামলাতে তিন-চারজন সিভিক পুলিশও দাঁড়িয়ে। একই মুখাববের মানুষজন ও লম্বা গাড়ির মিছিলে আটকে থাকতে হল কিছুক্ষণ। ভিড় ঠেলে শহরের বাইরে আসতে সময় লাগল প্রায় মিনিট পনেরো।
শহরের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই সমভূমিও বিদায় জানাল আমাদের। রাস্তার ডানদিকে ঢালু পাহাড়ের কোলে বসত বাড়িগুলি কাঠ ও কংক্রিটের তৈরী। প্রায় সব বাড়ির টিনের ছাউনিই মরচে পড়ে বাদামি রঙ ধারণ করেছে। বাড়িগুলির সামনের বাগানে নাম না জানা পাহাড়ি ফুলের মেলা। একতলা ছোট ছোট বাড়ি গুলির সামনে ও পিছনে কিছু সুপুরি গাছ দাঁড়িয়ে। রাস্তার বামদিকে খাদ নেমে গিয়েছে অনেকটা। প্রথমে সুপুরি ও বাঁশ গাছে ভরা থাকলেও চড়াই ওঠার সাথে সাথে তাদের ঘনত্ব কমতে থাকল। গভীর চওড়া খাদের শেষে চা বাগানে কাজ করছেন কিছুজন। তারও পিছনের ভূমি ঢালু হয়ে উঠে গিয়েছে অনেক উঁচুতে। চোখের সামনে গাঢ় কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের চূড়াগুলির অস্পষ্ট অবয়ব। দৃশ্যপট যেন কোন শিল্পীর ক্যানভাস। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে দৃশ্য অনুভব করতে করতে চলেছি।
চড়াইয়ে ওঠার সাথে সাথে রাস্তা ও পারিপার্শিক পরিবেশের পরিবর্তন হতে থাকলো দ্রুত। পিচের রাস্তা বর্ষার জলে ধুয়ে গিয়েছে বেশ কিছু জায়গায় তাই গাড়ি চলছিল সন্তর্পণে। এ অঞ্চলে বর্ষায় যে বড় ধস নামে তার নমুনা পাওয়া গেল কিছুটা এগিয়ে যেতেই। ক্রেন ও ঢালাই মেশিনের গর্জনের আওয়াজ কানে এসে পৌঁছাল। রাস্তা সমেত ডান দিকের পাহাড়ের বিরাট এক অংশের ধসের মেরামতির কাজে ব্যস্ত কিছু লোকজন। তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম পাতলা ক্ষয়ে যাওয়া পিচের সরু রাস্তায় লাফিয়ে লাফিয়ে। কিছুটা ছাড়া ছাড়া সামনে আসছিল ছোট ছোট পাহাড়ি গ্রাম ও তাদের বাসিন্দারা।
দশ বারোটি ঘর বিশিষ্ট গ্রামগুলি রাস্তার দুই পাশে বিস্তৃত। জমির ঢাল যেখানে একটু কম সেখানে ধাপে ধাপে চাষ হয়েছে ধান, আদা, কলা, কুমড়ো এবং আরও কিছু খাদ্যশষ্য। আর খাড়াই ঢালগুলিতে চাষ করা হয়েছে চায়ের। এতো উঁচু ও খাড়াই ঢালে কিভাবে চা পাতা তোলা হয় সেটা জানার কৌতূহল হলেও কাউকে দেখা গেল না পাতা তুলতে।
চড়াই ওঠার সাথে সাথেই ঠান্ডা তার দাঁত ফোটাতে শুরু করল আমাদের। রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া দেখে লাটাগুড়ি থেকে বেরোলেও পাহাড়ের আবহাওয়া যেকোনো মুহূর্তেই খারাপ হতে পারে তার সম্বন্ধে অবগত ছিলাম সকলে। রৌদ্রের ছিটেফোঁটাও এখন আর নেই। দূরের পাহাড়ের অবয়বগুলি তখন সম্পূর্ণরূপে ঢেকে গিয়েছে ধূসর কুয়াশায়। একপাল ঠান্ডা বাতাস যেন তাদের নিজেদের কব্জায় নিয়ে ফেলেছে গোটা এক পাহাড়কে। প্রায় ৩০০০ ফুট উচ্চতায় উঠে এসেছি এখন। পরিবেশও সেই উচ্চতার কথা আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিল যেন। গ্রামগুলির ঘনত্ব এখন আরও পাতলা হয়ে এসেছে। পুরোটাই কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে চলেছি তখন, পিচ প্রায় নেই বললেই চলে। রাস্তার ধারে তখন কমলা লেবুর গাছ ও মাঝে মাঝে ছোট ছোট বাঁশের ঝোপ।
পাহাড়ি এক গ্রামের পাশ দিয়ে যেতে চোখে পড়ল কিছু টুরিস্ট গাড়ি দাঁড়িয়ে। মালভূমির মতো জায়গাটিতে বড় একটি চা বাগানে কিছু মানুষ ব্যস্ত চাপাতা তোলায়। ভ্রমণ রসিক মানুষগুলি তাঁদের সেই মুহূর্ত গুলিকে বন্দি করছেন ক্যামেরায়। গ্রামের পাশের বাঁশঝাড়ের একটিতে দোল খাচ্ছে ছোট্ট একটি বাঁদর ছানা। একা একাই, তার পরিবারের আর কাউকেই দেখা গেল না। দুষ্টুটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। রাস্তা হঠাৎ ডানদিকে মুড়ে গিয়ে বিরাট এক পাথরের চাঁইয়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়েছে, সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না আর। গতি কমিয়ে এগিয়ে চলল গাড়ি। মনে হল নিচে নামছি এবার। একটি কংক্রিটের ব্রিজের পাশে এসে গাড়ি থামল কিছুটা অযাচিত ভাবেই।
(১২)
পাংখাসাড়ি খাসমহল। গভীর এক খাদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কালো পাথরের সুউচ্চ একটি টিলা। টিলাটির ঠিক নিচ দিয়েই গর্জন করে বয়ে চলেছে নাম না জানা খরস্রোতা সরু এক পাহাড়ি নদী। টিলার মাথায় ছোট্ট একটি সাদা মন্দির। লাল পতাকা যুক্ত লম্বা লম্বা বাঁশের কাঠি পোঁতা মন্দিরটির চারিদিকে। ফার্ন ও জংলী লতাপাতায় ঘেরা পায়ে হাঁটা একটা সরু পথ, টিলাটির পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে নিচে। আমরাও পা বাড়ালাম সেদিকে।
বছর আট-দশের স্থানীয় একটি ছেলে টিলাটির মসৃন গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। অতি ব্যবহারে জীর্ণ নীল রঙের কোট পরিহিত কিশোরটির জামার ওপরের বোতামটি ছেঁড়া। মাথার চুল উস্কোখুস্কো, খালি পা, ভাসাভাসা চোখে আমাদের দেখেতে থাকল। ওকে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে গেলাম।
বড় বড় পাথরের চাঁই ভেঙে স্বচ্ছ শীতল ধারা গর্জন করতে করতে লাফিয়ে চলে যাচ্ছে আরও নিচে। সাদা, কালো, বাদামি, খয়েরি রঙের পাথরের চাঁইগুলির গা মসৃণ। বর্ষায় এই নদীই যে ভয়ঙ্করী হয়ে ওঠে তার প্রমাণ বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সেগুলি। নদীর ওপারের পাথরের নুড়িগুলির পিছনে বাঁশ, বেত ও মাঝারি উচ্চতার আরও কিছু জংলীগাছে ভরা খাড়াই ঢাল উঠে গিয়েছে ওপরে। ভয় হল এই বুঝি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ঘাড়ের ওপর।
সুন্দর হলেও জায়গাটি কেমন বিষাদের ছায়ায় মোড়া। দুইদিকে বিরাট বিরাট পাহাড়ের দেওয়াল, তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে সুন্দরী অথচ ভীষণ রাগী এক নদী। অল্পক্ষণেই প্রাণটা হাঁপিয়ে ওঠে যেন। ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা, আরও অনেক চড়াই ওঠা বাকি। তাই ফিরে এলাম গাড়িতে। সেতুটি পার হওয়ার সময় দেখলাম কংক্রিটের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সেই কিশোরটি। বিষন্ন মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে…
(১৩)
পাংখাসাড়ি খাসমহল পেরিয়েই আবার চড়াই ওঠা শুরু। এতক্ষণ যে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠছিলাম তাকে পিছনে ফেলে রাস্তা এগিয়ে গিয়েছে সামনের পাহাড়ে। এই পাহাড়ের ঢাল অনেক বেশি খাড়াই এবং গ্রামগুলি স্থানে স্থানে জমাট ভাবে তৈরী। কাঠের বাড়ি আর চোখে পড়ল না, বরং টিনের চালাযুক্ত কংক্রিটের দেওয়াল দেওয়া বাড়িগুলির কোনওটা একতলা আবার কোনওটা দোতালা। খুব বেশি লোকজন দেখা গেল না রাস্তায়, গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত বোধহয় সকলে। এক মাথা কাঁচাপাকা চুল, ফর্সা মুখের বয়স্কা একজন মহিলা ছোট গুমটি দোকানঘরের দালানে বসে। গাড়ির শব্দে বয়সের বলিরেখায় ভরা মুখাবয়ব তুলে, ছোট ছোট চোখ কুঁচকে দেখলেন আমাদের।
তাঁকে পেরিয়ে আঁকা বাঁকা রাস্তায় চড়াই উঠতে থাকলাম। খাড়াই কখনো বামদিকে আবার পরক্ষণেই ডানদিকে। এই খাড়াইয়ে আর চাষ সম্ভব নয় বলেই হয়তো চা বাগানগুলি অদৃশ হয়ে গেল একেবারে। পিচের রাস্তায় পিচ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই আর। কুয়াশায় ঢাকা ছোট ছোট পাহাড়ি গ্রামগুলি ছবির মতো ফুটে উঠছিল পথের বাঁকে বাঁকে পাহাড়ের কোলে। গ্রামগুলির শেষে গভীর উপত্যকা ও তারও পিছনে ফেলে আসা পাহাড়ের অস্পষ্ট অবয়ব যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। অবাক লাগল, কিছুক্ষণ আগেই সেই অজানা পথ আমাদের জানা হয়ে গেলেও আবার কেমন অচেনা হয়ে যাচ্ছে এই অল্পক্ষণেই।
সাপের মতো আঁকা বাঁকা রাস্তার জায়গায় জায়গায় বর্ষা তার ক্ষমতা প্ৰদর্শন করে গিয়েছে দিন কতক আগেই। ওপর থেকে গড়িয়ে আসা নুড়ি পাথরে মোড়া একচিলতে রাস্তায় লাফিয়ে লাফিয়ে সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছি আমরা। একদিকের পাহাড়ের দেওয়াল খাড়াই ভাবে উঠে গিয়েছে ওপরে আর অন্যদিকের খাদ ভীষণ চড়া। সত্যি বলতে এই অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় এই প্রথম, তাই খাদের নিচে তাকাতে বুক কেঁপে উঠছিল বার বার। ছবি তোলার কথা মাথা থেকে উবে গিয়েছে কখন। গাড়ির হ্যান্ডেল জাপটে ধরে ইষ্টনাম জপ করছি মনে মনে। আবার এই পথ ধরেই ফিরতে হবে ভেবে বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছিল আরও জোরে জোরে।
আমাদের সকলের অবস্থাই প্রায় এক। গাড়ির ভেতরকার পরিবেশ তখন বেশ থমথমে। সচল কেবল সদন। সে তার পোক্ত হাতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে গাড়িসমেত সকলকে। কিছুটা সময় কাটল এভাবে। মাঝে মাঝে আড়চোখে আমাদের দিকে দেখে মুচকি মুচকি হেসে চলেছে সদন। শেষে আমাদের আস্বস্ত করে জানাল, সপ্তাহে অন্তত দুই-তিন বার আমাদেরই মতো ট্যুরিস্টদের নিয়ে এই রাস্তা পারাপার করে সে। আরও অনেক উঠতে হবে তাই এতো ভয় পেলে চলবে না। তার কথা শুনে ভাল লাগলেও ভয়টা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগল বেশ কিছুক্ষণ। মনকে শান্ত করে বললাম, যা হয় হোক গে আর গুটিসুটি মেরে বসে থাকা নয়। চাপা ভয়কে সাথে নিয়েই শুরু হল পথ চলা। ক্যামেরাও তৈরী তাই চোখ চলে গেল ভিউ ফাইন্ডারে।
(ক্রমশ)