দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাঙালীর ঘরে এল উমা। শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনন্দে মশগুল গোটা একটা জাতি। স্রোতের তালে গা ভাসিয়ে উল্লাসে আত্মহারা আমরাও। খুশির জোয়ারে ভাসলেও মন মশগুল অন্য উৎকন্ঠায়। দিন চারেকের ছুটি কাটিয়ে, বাপের বাড়ির সবাইকে কাঁদিয়ে মা ফিরল তার সংসার সামলাতে। চোখের জলে বিদায় জানিয়ে আবার শুরু হল ফেরার দিন গোনা। আমাদেরও সময় হয়ে এল যাবার।
আমাদের গ্রামে কোজাগরী পূজোর বড় মেলা বসে ফি বছর। শারদোৎসবের মতো রোশনাই না থাকলেও, এর টানে দূর দেশে কর্মরত লোকজন ঘরে ফেরে। কটাদিন একসাথে মজায়-আনন্দে কাটিয়ে রওনা দেয় নিজের কর্মস্থলে। এ যেন এক বাড়তি পাওনা আমাদের। সেই মেলার টানটাও এবার কেমন যেন ঢিলে মনে হচ্ছিল ব্যাগ গোছানোর তাড়ায়। আমি কলকাতা থেকে রওনা দেব, তাই কলকাতা ফেরার তাড়াও ছিল। বাকী দুই বন্ধু তাদের পরিবারের সাথে আমাদের মিট করবে স্টেশনে। ওরা আসবে মেদিনীপুর থেকে, তাই ওদের সফর শুরু হবে সকাল সকাল।
প্রাক নভেম্বর, কলকাতায় যথেষ্ট গরম, তবুও শীতের পোশাক নিতে হয়েছে আমাদের। সৌম্যজিৎ আগে থেকেই সতর্ক করে রেখেছে আমাদের কারণ ডুয়ার্সে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে এখনই। এছাড়াও পাহাড়ে ওঠার প্ল্যান করে রাখা আছে তাই গরম পোশাক মাস্ট।
উত্তেজনার পারদ তখন চরমে, কিন্তু দিন কাটছে যেন ধীরগতিতে। দেখতে দেখতে সেই দিন এসে উপস্থিত। অফিস থেকে কিছু আগেই বাসায় ফিরে, জিনিসপত্র মিলিয়ে নিলাম আরও একবার। তারপর রাতের খাওয়া সেরে রওনা দিলাম কলকাতা স্টেশনের উদ্দেশ্যে। পথেই বন্ধুদের ফোন পেলাম, ওরা স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছে। সত্যি বলতে, নিজেদের পরিকল্পনায়, নিজেদের দায়িত্বে কোথাও বেড়াতে যাওয়া এই প্রথম। বাঙালী যে কতটা ভ্রমণপিপাসু, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। কলকাতা স্টেশনে ট্যাক্সি থেকে মালপত্র যখন নামালাম ঘড়ির কাঁটা সবে ৯ টা ছুঁয়েছে। হাতে কিছুটা সময় এখনও আছে।
রাত্রি ৯:২০, আমাদের বহু প্রতীক্ষিত সেই ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল। কামরা খুঁজে পেতে সময় লাগল কিছুটা। প্রথমবার বলেই ঠোক্কর খেতে হচ্ছিল একটু। ৯:৪০ -এ লম্বা বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন ডিব্রুগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আর তার সাথেই আমাদের যাত্রাও শুরু হল। একঘেয়ে এই হাঁপিয়ে ওঠা জীবনে একটু মুক্ত অক্সিজেন সঞ্চার করতে বেরিয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশ্যে। ছোট্ট এক অবকাশ আর আমরা কয়েকজন বন্ধু ও বান্ধবী। নূতনকে জানার অদম্য কৌতুহল আর উদ্দীপনাকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে চললাম পাহাড়ী জীবনের স্বাদ নিতে…
(২)
ভারতীয় রেল, উপমহাদেশের একটি নিরবিছিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অতীতের অনেক ভার বহন করে চলেছে তার প্রবহমান জীবনযাত্রায়। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে ঠিকই তবে ঐতিহ্যও অটুট রাখার মরিয়া চেষ্টা করে চলেছে সে। ব্রিটিশদের এই দানকে মাথা পেতে নিতে কসুর করেনি ভারতবাসী বরং কুর্নিশই করেছে। সেই ঐতিহ্যের ভাগীদার হতে পেরে ভালই লাগছিল। উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হবার কোনো লক্ষণই দেখতে পাচ্ছিলাম না।
যে বার্থটা আমদের দেওয়া হয়েছিল সেটা ছিল এক কথায় অতি নিম্নমানের। সামনেই শৌচালয়, যাকে ঠিক পরিচ্ছন্ন বলা যায় না। বেসিনের কলটা খারাপ। টিপ টিপ করে জল পড়ে চলেছে অবিরত। সেই জল মেঝেতে পড়ে গড়িয়ে চলল আমাদের বার্থ ছাড়িয়ে। লোকজনের যাতায়াতের ফলে সেটা কাদা ও নোংরায় পরিণত হতে বেশী সময় নিল না একটুও। ব্যাগগুলি আপার বার্থে তুলে দিতে হল। মন ভেঙে গেল ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় রেলের এই পরিষেবায়। গ্রামের মানুষের মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতাটা হয়তো একটু বেশিই, তাই এ সব চাপা পড়ে গেল সময়ের সঙ্গে। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে আমাদের আড্ডার তাল কাটতে লাগল। সাড়ে এগারোটা নাগাদ বন্ধুরা সবাই যে যার বার্থে উঠে ঘুমোতে চলে গেল। আমি জানালার বাইরে চেয়ে দেখতে থাকলাম রাত্রের শহরতলির শ্লথ হয়ে আসা জীবনযাত্রার ছবি।
ট্রেন সবে রানাঘাট ছেড়ে রওনা দিয়েছে। কিছু যাত্রী ভুল করে আমাদের কামরাতে উঠে, ভুল বুঝতে পেরে কোলাহল জুড়ে দিল। চেঁচামেচিতে আর বাইরের দৃশ্য ভালো লাগছিল না তাই আমিও চলে গেলাম ঘুমোতে। নবদ্বীপে ট্রেন থামার কিছু আগে দেখা মিলল রেল পুলিশের। ফিরে যাওয়ার সময় তাঁরা অনুরোধ করে গেলেন দরজা বন্ধ করার। স্টেশন ছাড়ার পর দরজা আটকে শুয়ে পড়লাম। প্রতি হল্ট স্টেশনে দরজায় ধাক্কা, আর উঠে গিয়ে দরজা খোলা – এই চলতে থাকল। বন্ধুরা সবাই ঘুমোচ্ছে আর ব্যাগগুলোও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে, তাই ঘুম আর হল না। জেগেই কাটিয়ে দিলাম সারা রাত।
দূরে আকাশ লাল হয়ে আস্তে আস্তে ভোর হল। সবাই জেগে ওঠার আগেই হাতমুখ ধুয়ে ফিরে এলাম নিজের জায়গায়। জানালার দিকে ফিরে বসে দিগন্তবিস্তৃত সোনালী ধানের ক্ষেতের আঘ্রাণ নিতে নিতে ছুটে চলেছি। সময় আর গতির সাথে সাথে ক্ষেত ও যেন তার চরিত্র বদলাতে থাকল… ধান, আনারস, কলা আরো কত কি…
আনারস যে একসাথে এত জমিতে চাষ হয় সেটা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছি এমন সময় দূরে চা বাগানের ঝলক দেখা দিল। প্রথম স্বচক্ষে দেখা চা বাগান। বাগান দেখতে বন্ধুরা সকলে হামলে পড়ল জানালায়। আমি অনবরত ক্লিক করে চলেছি আমার ক্যামেরায়। বিনিদ্র রাত্রির ক্লান্তি তখন উধাও। উত্তেজনায় টগবগ করে ছবি তুলে চলেছি একের পর এক।
কটা বাজে তখন খেয়াল নেই। হঠাৎ মোবাইলের টুং টাং শব্দে ছন্দ কেটে গেল। গাড়ী আমাদের নিতে এসে পড়েছে স্টেশনে, সেটি জানাতেই এই ফোন। ট্রেনের তখনও ৩০ মিনিটের পথ চলা বাকি। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে সে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তাই বাকি পথ চলল দুলকি চালে। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ট্রেন যখন পৌঁচোল তখন ঘড়ি ৯টা পার করেছে। ট্রেন লেট! তাও প্রায় ঘন্টা খানেক।
নিউ জলপাইগুড়ি জংশন! বেশ বড় ও ব্যস্ত স্টেশন। এখান থেকেই উত্তর-পূর্ব ভারতের সমস্ত দিকের পথ পাড়ি দেওয়া যায়। তাই টুরিস্টে গমগম করছে জায়গাটা। স্টেশন থেকে বেরিয়ে গাড়ী খুঁজে নিতে বেশী দেরী হল না আমাদের। ব্যাগপত্র সব তোলা হল ছাদে। রাস্তায় কিছু খেয়ে নেব ঠিক করে চড়ে বসলাম গাড়ীতে।
সকাল ৯:৪৫, আমরা রওনা দিলাম স্টেশন থেকে। লক্ষ্য লাটাগুড়ি…
(৩)
সদন, নামটি আমাদের কাছে কিছুটা অপরিচিত। তবে নামে কি আর আসে যায়। নিজের কাজটা ভালই বোঝে সে। ফোনে গলা শুনে বুঝতে পারিনি যে সে আমাদেরই বয়সী। পোক্ত হাতে নিজের কাজটি করে যেতে থাকল। স্টেশনের পাশেই একটি সেনা ছাউনি, পুরু গোঁফওয়ালা এক সেনা জওয়ান গেটের মুখে দাঁড়িয়ে। তাঁর কৌতুহলী দৃষ্টি ফেরানো আমাদের দিকে। ওঁকে পাশ কাটিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যের দিকে।
স্টেশন লাগোয়া দোকান, বাজার, বসতবাড়ী একে অপরকে জড়াজড়ি করে রয়েছে। ভীষণ ঘিঞ্জি আর মাঝে মাঝেই আবর্জনার স্তূপ। অনেক লোকজনের আনাগোনা শিলিগুড়ির এই অঞ্চলে। সার সার ভাড়ার গাড়ি অপেক্ষা করছে তাদের প্রতীক্ষিত পর্যটকদের আশায়। যেহেতু এটি একটি জংশন তাই এখান থেকে নর্থ-ইস্ট -এর সব রুটের গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়, শেয়ারে বা একান্তই নিজেদের জন্য। কিছুটা দরদাম করে নিতে হয় এই যা।
অনেক অলিগলির ভেতর দিয়ে সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে চলতে লাগল আমাদের গাড়ি। কিছুদূর এগিয়ে গাড়ি দাঁড়াল তার খিদে মেটানোর জন্য। আমাদেরও পেটে কিছু পড়েনি। ব্যাগে শুকনো খাবার ছিল, সেগুলি দিয়েই প্রাতরাশ সারা হল। গাড়ির তেষ্টা মিটে গেলে, সে আবার ছুটতে লাগল ভিড় এড়িয়ে মসৃণ কালো রাস্তার ওপর দিয়ে। সামনের রেল গেটে আটকে কিছু গাড়ি, সামান্য বিরতি। তারপর রেলগেট পার করে আবার শুরু পথ চলা, কোন এক অজানা পথে।
শহরের কোলাহল মিলিয়ে গিয়ে গাছপালা মোড়া প্রান্তরের মাঝে এসে পড়লাম ক্ষনিকেই। আরও এগোতেই পথের দুধারে সারি সারি চা বাগান। গাড়ি থেকে নেমে, ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছে করছিল সকলের। মুচকি হেসে সদন ইশারায় জানাল উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখতে। এইতো সবে শুরু, এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকী।
লোকালয় ছাড়িয়ে আমরা যখন ক্যানাল রোড ধরলাম, সুয্যিমামা তখন মধ্যগগনে। সোনালী ক্ষেত আলতো হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। রাস্তার পাশের জঙ্গল থেকে উঁকি দিচ্ছে লাল-সাদা পাখি। ওইতো! কি যেন একটা গাছে দোল খাচ্ছে কিছু হনুমান। প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে এ ফুল থেকে ও ফুলে। দূরে একটি রাখাল বালক কিছু গরু নিয়ে চলেছে। চাষীরা তাদের সোনার ফসল কাটা শুরু করে দিয়েছে কোথাও কোথাও।
সদন জানাল, এই অঞ্চলে হাতির উপদ্রব হয় মাঝে মাঝেই। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে, তারা পাকা ধান খেতে চলে আসে লোকালয়ে। ওর কথা শুনে রোমাঞ্চিত হলেও, চাষিদের অবস্থা ভেবে খারাপ লাগল।
এতক্ষণ যে ক্যানালটির পাশ দিয়ে চলেছি সেটি ছিল শুকনো, কিছুটা এগোতেই দেখলাম তাতে টলটল করছে জল। ফুটে রয়েছে লাল, গোলাপি পদ্ম। সরু ক্যানালের দুই পাড় কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো। তার পিছনের জঙ্গল আরও ঘন হতে থাকল ধীরে ধীরে। ঝিঁঝিঁ ডেকেই চলছে অনবরত। গা ছমছম করতে লাগল। এই বুঝি কোন দলছুট দাঁতাল বেরিয়ে এসে আটকে দেবে আমাদের যাত্রাপথ!
একটু এগোতেই চওড়া এক নদী পথ আটকে দাঁড়াল আমাদের। তিস্তা। এই সেই তিস্তা…?!! যাকে নিয়ে পশ্চিম আর পুবের এতো দ্বন্দ্ব। অগুনিত পাল্লা ফেলে আটকে রাখা হয়েছে তার জল। পাঠানো হচ্ছে পাশের ক্যানাল দিয়ে। নদীর মাঝ বরাবর তিস্তা ব্যারেজ, তার বজ্র আঁটুনি দিয়ে আটকে রেখেছে বিশাল জলধারাকে। সেই শক্ত পাল্লার ফাঁক গলে বেরোতে চাইছে বিপুল জলরাশি। তাদের গর্জন যেন জানান দিচ্ছে, তারা আর কিছুতেই মানতে চায় না মানুষের এই দাসত্ব।
নাম-না-জানা পরিযায়ী পাখিরা ভিড় জমিয়েছে নদীতে। একটি সারস জলের দিকে চেয়ে বসে, দৃষ্টি তার স্থির। দস্যি এক পানকৌড়ি সবে স্নান সেরে ডানা শুকোতে বসেছে। বেশ কিছু বুনো হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে জলে। কিছু চিল ইতস্ততভাবে চষে বেড়াচ্ছে আকাশ। অনেকটা বড় চড়া পড়েছে বাঁধের অন্যদিকে, নদীর ধারা সেখনে ক্ষীণ। লম্বা চড়ায় নুড়ি পাথরের মাঝে নিজেদের মধ্যে খেলা করছে কয়েকটি কুকুর।
গাড়ি এখানে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর আবার চলা। আবার মাঠ আর জঙ্গল। সবুজ আর সোনালীর খেলা। প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করল। কত নদী যে পেরিয়ে চলেছি তার হিসাব নেই। পথ যত এগিয়ে চলেছে এঁকে বেঁকে অজগর সাপের মত, তত মনোরম হচ্ছে পরিবেশ। ঘোরের মধ্যে চলেছি, প্রকৃতির অপার রূপ দেখতে দেখতে। কখন যে গাড়ি থামল বুঝতেই পারলাম না। ঘোর কাটিয়ে দেখি রিসর্ট এসে গেছে।
(ক্রমশ)