(৪)
লেক ভিউ। ছোট্ট একটি পুকুরের পাড়ে এর অবস্থান বলেই হয়তো এই নাম। পিছনে ঘন জঙ্গল, সামনে ৩১ নং রাজ্য সড়ক গরুমারা ন্যাশনাল পার্কের বুক চিরে সোজা চলে গেছে চালসা গোলাই, মিশেছে আলিপুরদুয়ার রোডের সাথে। জঙ্গলে ঘেরা শান্ত পরিবেশ, পাখির কিচির মিচির আর মাঝে মাঝে ময়ুরের কেকা, মুগ্ধ করছিল আমাদের।
রিসর্ট বুক করা ছিলো আগেই। গাড়ী থেকে মালপত্র নামিয়ে, ম্যানেজারের সাথে সাক্ষাত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক পর্ব সারা হল। রিসেপশনের সাথেই খাবার ও বসার জায়গা। এখান থেকে রিসর্টের গোটা সীমানাটাই দেখা যায়। আমাদের আবাসস্থল একটি কাঠের তৈরী দোতলা বারান্দা বাড়ী, রিসেপশনের পিছন দিকে। রিসেপশন থেকে এখানে আসার পথটি নুড়ি বিছানো। সেই পথ ধরে কচমচ শব্দ করে চলে এলাম আমাদের আস্তানায়।
রাস্তা থেকে সিঁড়ি সোজা উঠে গেছে দোতলার বারান্দায়, নিচের তলার বারান্দা বা ঘরের সাথে কোনরকম যোগাযোগ ছাড়াই। বাড়িটি একেবারে জঙ্গল লাগোয়া। রিসর্টের সীমানার শেষে একটা ছোট্ট পুকুর। তার পাড়ে গোল করে ছাদ বাঁধানো একটি মাচা, একসাথে বসে আড্ডা দেবার জন্য। পুকুরের অন্য পাশে দু-তিনটি কাঠের কটেজ।
জঙ্গল ঘেঁষা কাঠের এই বাড়িটিতে পর পর তিনটি ঘর। দোতলা বলেই আলো বাতাস একটু বেশিই। বাইরের বারান্দায় গাছের গুঁড়ির চেয়ার বসানো। বেশ চওড়া, কাঠে বাঁধানো বারান্দাটি পোক্ত মনে হলেও চলাফেরার সময় করুন আওয়াজ করে সে তার যন্ত্রণার কথা জানান দিচ্ছিল বারবার। বাড়ীটির ছাউনি টিনের। রোদ-জলে সেটি বাদামী রঙ ধারণ করেছে।
দুপুর ১২ টা নাগাদ আমাদের রুমে প্রবেশ করলাম। প্রথম ঘরটির দখল নিলাম আমি আর সুমনা। মাঝের ঘরে শোভন, সীমা ও ছোট্ট সানা। শেষের ঘরে সুনীল ও তার ঘরণী। রুমের পিছনের দরজা খুলতেই ঘন জঙ্গল যেন বুকে জড়িয়ে নিল। সেখানেও বসার একটি বেঞ্চ, তাতে কিছুক্ষণ বসে, ফিরে এলাম রুমে। পিছনের দরজা খুলে রাখার সাহস হল না, পাছে অযাচিত কোন আগন্তুক ঢুকে পড়ে।
ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে নিজেদের মতো করে গোছানো হল রুমটিকে। বেয়ারা চা দিয়ে গেল বাইরের বারান্দায়। টাটকা বাগানের চা, যেমন দারুণ তার স্বাদ তেমনই সুবাস। কিছুক্ষণ চা চক্র চলল। তারপর সবাই ফ্রেশ হতে চলে গেলাম।
মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা খুব ভালো। চমৎকার স্বাদের বাহারি রান্না, সকলে খেলাম তৃপ্তিভরে। খাওয়ার পর্ব মিটতে ১:২০। বিকেলে জঙ্গল সাফারিতে যাওয়া হবে তাই একটু রেস্ট নেবার প্রয়োজন। ভুরিভোজ সেরে রুমে ফিরে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই চারিদিক অন্ধকার।
শোভনের ডাকাডাকিতে ধড়ফড়িয়ে উঠে যখন লাটাগুড়ি ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস ছুটলাম, ঘড়িতে তখন ৩:৩০। ঘন সবুজ রঙের উর্দি পরে গাইড -রা দাঁড়িয়ে আর তাদের ঘিরে জটলা করছে বিভিন্ন টুরিস্ট। অফিসের মুখে লম্বা লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলাম প্রায় ঘন্টাখানেক। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো হঠাৎ, অফিস থেকে খবর দিল, সমস্ত জীপ ভরে গিয়েছে তাই ঐদিনের মত সাফারি বন্ধ। অগত্যা, নিজেকে দোষারোপ, কেন যে খামোখা ঘুমোতে গেলাম। না পেলাম শ্যাম, না রইলো কুল। ঘুম আর সাফারি দুটোই গেল। ফিরে আসতে হল শূন্য হাতে।
আশেপাশের জায়গা ঘুরে দেখতে বেরোলাম সন্ধ্যায়। রিসর্ট থেকে ৩১ নং রাজ্য সড়কটি ধরে মিনিট দশেকের হাঁটা পথে লাটাগুড়ি বাজার। রাস্তায় কোন আলো নেই, পূর্ণিমার চাঁদ সবে উঁকি দিচ্ছে জঙ্গলের পিছন থেকে। তার ফিকে আলোয় অন্ধকার আরও জাঁকিয়ে বসেছে যেন। অজানা আতঙ্কে হাঁটতে ভয় করছিল সকলের। এই বুঝি বাইসনের দল তেড়ে আসে, নয়তো লকলকে জিভ বের করে ঝোপের আড়াল থেকে ঘাড়ে লাফ মারে লেপার্ড।
মোটের ওপর বেশ বড় জনপদ লাটাগুড়ি। গরুমারা ন্যাশনাল পার্কের নেশায় পর্যটকদের সমাগমে বেশ কিছু দোকানপাট গড়ে উঠেছে ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসকে কেন্দ্র করে। গুটিকতক দোকানপাট খোলা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির পসরা সাজিয়ে বসে রয়েছে স্থানীয় ব্যবসাদারেরা। খানিকক্ষণ এদিক ওদিক বেড়িয়ে মোমো খেতে উঠলাম একটি দোকানে। ভেজ মোমো সাথে স্কোয়াশের স্যুপ, চমৎকার স্বাদ। ফেরার পথে একটি হ্যান্ডলুম দোকানের জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করে ফিরে এলাম রিসর্টে।
রাত ৮:৩০। সৌম্যজিৎ অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। বছর পঁচিশের মিতভাষী এক যুবক। হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাল আমাদের। ফোনে কথা হলেও এই আলাপ হল। পরের দুদিনের ট্যুর পরিকল্পনার কথা জানালাম। ও সেই মত গাড়ি বুক করে দিল।
৯ টায়, রাতের খাবার খেয়ে, রুমে ফিরে এলাম। কাল অনেক ভোরে উঠতে হবে। সাফারি আর মিস করা যাবে না, তারপর আবার গোটা দিনের সফর। চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। আগের রাতের ট্রেন জার্নি, আজকের এই ধকল আর অনবদ্য স্মৃতিগুলো কালো ধোঁয়ার ভেতর কুন্ডলী খেতে খেতে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে লাগল…
(৫)
গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক। পরিচিতি, ছোট্টবেলার বইয়ের পাতায়। শিশু বয়সের সেই গরুমারা আর জলদাপাড়া। পশ্চিমবঙ্গের এ দুটি অভয়ারণ্যে একশৃঙ্গ গন্ডারদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। গন্ডার ছাড়াও বাইসন বা গাউর, লেপার্ড, বুনো শূকর, শেয়াল, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, হাতি এবং আরও প্রায় ৫০ প্রজাতির প্রাণীর মুক্তাঞ্চল। পশুকুল ছাড়াও প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি ও ২৫ রকমের সরীসৃপ দের আবাসস্থল এটি। পাশাপাশি দুটি অভয়ারণ্য গরুমারা ও চাপরামারিকে আলাদা করে রেখেছে মূর্তি নদী। সবুজের সমারোহ যে কি জিনিষ তা চাক্ষুষ না করলে বোঝানো যায় না। ভ্রমণপ্রিয় পর্যটকদের হাতেখড়ি দেবার জায়গা। এ জঙ্গলের নাম কেন যে গরুমারা তা জানি না, কাউকে জিগ্যেসও করিনি কখনও।
ভোর ৫:৩০, পথঘাট প্রায় শূন্য। মাঝে মাঝে মালবাহী ট্রাক ছুটে যাচ্ছে দুরন্ত গতিতে। নভেম্বরের শুরুতেই বেশ ঠান্ডা এখানে। গায়ে একটা কোট চাপিয়ে, গলায় মাফলার জড়াতে হয়েছে। আবছা কুয়াশাও রয়েছে। জঙ্গলের দিকটা নিস্তব্ধ। রিসর্ট থেকে ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস প্রায় দশ মিনিটের হাঁটা পথ। সেখানে পৌঁচে দেখলাম ভিড় তখনও জমেনি। দু একজন আসতে শুরু করেছেন সবে। অফিস তালাবন্ধ।
পাশের চায়ের দোকানের উনুনে সবে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে। ৬ টায় অফিস যখন খুলল ততক্ষণে বেশ কিছু লোকজনের ভিড়। তিনজনের পর আমাদের নম্বর। ফোন করে সবাইকে বেরিয়ে আসতে বলে, আমি প্রয়োজনীয় কাজগুলি সারতে থাকলাম। পারমিট বের করতে সময় লাগল আরও মিনিট দশেক।
কালচে সবুজ রঙের হুডখোলা জিপসি। রাইনো – ০৬। মুখোমুখি তিন-তিন, মোট ছয়জনের বসবার জায়গা। সামনে ড্রাইভার ও তার পাশে গাইড।
সকাল ৬:২৫, শুরু হল আমাদের জঙ্গল ভ্রমণ। নিবিড় বনানীর বুকচিরে ভেতরে চলে গিয়েছে এক চিলতে পথ। গাড়ীর চাকায় মাড়ানো পথের ওপর ঝুঁকে পড়েছে ঘাস। তাদের পাতায় হীরকের মত চিক চিক করছে বিন্দু বিন্দু শিশিরকণা। আমরা এগিয়ে চলেছি একফালি অরণ্যবিথীর মধ্যে দিয়ে। ধূসর কুয়াশায় আচ্ছন্ন জঙ্গল মায়াবিনী হয়ে উঠেছে আরও। গাছের পাতার সেই হীরক কণা ঝরে পড়ছে আমাদের গায়ে। ভীষণ ঠান্ডা সে বিন্দু। প্রকৃতি যেন আমাদের সতর্ক করে বলছে, যাও ফিরে যাও, এ স্থান একান্তই আমার, বাকিরা সবাই অযাচিত। কিছু দূরে, নুড়ি বেরোনো হাড়গিলে রাস্তা আমাদের ঝাঁকিয়ে দিয়ে সেই সতর্কবাণীকে আরও দৃঢ় করল যেন…
হঠাৎ জীপ থেমে গেল। অনেক চেষ্টার পরও চলতে পারছে না সে। আমরা ভীষণ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম ড্রাইভারের দিকে। জঙ্গল যেন রসিকতায় মেতে উঠেছে আমাদের সাথে। একলাফে গাইড নামল গাড়ি থেকে। ধাক্কা দিতে থাকল পিছনে গিয়ে। জীপের চাকা বসে গিয়েছে নরম মাটিতে। রাত্রে বোধহয় বৃষ্টি হয়েছে এদিকে। কিছুক্ষণের চেষ্টায় গাড়ি আবার চলতে লাগল। আমরা নিশ্চিন্ত হলাম। কিছুটা দূর এগোতে একটি হাড় জিরজিরে কালভার্ট। সেখান থেকে আরো একটা জীপ পিছু নিল আমাদের।
জঙ্গলের নিয়ম কড়া, এখানে রেষারেষি মানা। তাই পিছু পিছু চলতে থাকল সঙ্গী জীপটা। লম্বা লম্বা শাল, সেগুন, ইউক্যালিপ্টাস, অর্জুন, বকুল, আম, শিরিষ, নিম আরো অনেক গাছের গভীর বন। বেশ কিছুটা চলার পর জঙ্গল হঠাৎই শেষ হয়ে লোকালয় এসে পড়ল। আমাদের মন ভার। প্রকৃতি দেবী যেন কোন কারনে বিরূপ তাই তাঁর সন্তানদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন না আমাদের।
ছোট একটি গ্রাম, গোটা দশেক বাড়ী। বাড়ীগুলির একটু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। মাটি থেকে কিছুটা উচুঁতে মাচা করে তাতে বসবাস করেন এখানকার লোকজন। হাতির উপদ্রবের থেকে বাঁচতেই নাকি এই ব্যবস্থা। উঠোনে খেলা করছে মুরগীর ছানা। পাশের ক্ষেতে ধান পেকে গিয়েছে। তার মাঝে চরে বেড়াচ্ছে কতগুলো মোরগ। গ্রামের মাঝে একটি প্রাথমিক স্কুল। স্কুলটির পাশে টিনের চালের ছাউনি দেওয়া একটি বাড়ীর দেওয়াল ভাঙা। বুনো হাতির কীর্তি। গাইড জানাল, সপ্তাহ দুই আগে জঙ্গল থেকে হাতি হানা দিয়েছিল মিড ডে মিলের চালের লোভে।
লোকালয় পার করে জীপ আবার প্রবেশ করল অরণ্যভূমিতে। জঙ্গলের এই অংশ চিরগোধূলিময়। প্রকান্ড প্রকান্ড মহীরুহগুলি তাদের বিশাল ডাল পালা মেলে দিয়ে আটকে রেখেছে সূর্যের ঔজ্জ্বল্য। তাদের কাল-বাদামি কাণ্ডে হরেক রঙের শ্যাওলা ও পরগাছার বাস। তীক্ষ্ন ঝিঁঝিঁর ডাক অরণ্যের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে কানের পর্দায় আঘাত করছিল। কোনো পশুপাখির দেখা নেই। গাইড জানাল এখানেই নাকি কাল বিকেলে একপাল হাতি দেখেছিল সে। আজ তারা বনের গভীরে চলে গিয়েছে বোধহয়। এখানে জঙ্গল এত ঘন যে দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে সামনেই। ঝোপঝাড়ের পিছনে যে কি আছে তা জানা যাচ্ছে না। আমি গাছের ডালের দিকে নজর রাখছিলাম। লেপার্ড তো ওখানেই ঘাপটি মেরে থাকে তাদের শিকারের জন্য, এই বুঝি ঘাড়ে লাফ দেয়।
জীপ বাঁয়ে ঘুরল, আরে গাছের ওপর ওটা কি? বিরাট বড় একটি বাজ! পলকেই ডানা মেলে গা ঢাকা দিল অন্ধকার অরণ্যানীতে। রাস্তার ধারে একা দাঁড়িয়ে একটি ওয়াচ টাওয়ার। কোনো এক দৈত্য যেন বিরাট একটা গাছকে উপড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে তার পাশে। জীপ তার গতি বাড়াতে লাগল। ফার্ণে ঢাকা দুটি ঢিবির মাঝ দিয়ে চলে গিয়েছে রাস্তা। সেটি পার হতেই জঙ্গল পাতলা হয়ে এল। বুঝলাম আবার তার প্রান্তে এসে পড়েছি।
কোন কিছুরই দেখা মিলল না। গাইডও হতাশ। তাই উনি আমাদের নিয়ে চললেন অন্য একটি পয়েন্টে। ফরেস্ট চেকপোস্ট পার করে, ৩১নং রাজ্য সড়ক ক্রস করে এবার যে জঙ্গল প্রবেশ করলাম সেটি মনুষ্যসৃষ্ট। এর গাছগুলি অপেক্ষাকৃত ছোট আর জঙ্গল অনেক পাতলা। এটি মূলত এলিফ্যান্ট করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই হাতির বা বাইসনের দেখা মিললেও মিলতে পারে। সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই অরণ্যের অপরিসর রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ঝোপঝাড়ের ঝাপটা খেতে হচ্ছিল। শেষে চওড়া রাস্তায় গিয়ে উঠলাম।
(৬)
রাস্তার একপাশে বড় বড় সেগুন গাছ অন্যদিকে মাদার, অর্জুন, জাম, শিরিষের মেলা। আবছা আলোয় দূরে কোন একটি প্রাণী মুখ তুলে আমাদের আসতে দেখে টুক করে ঢুকে গেল জঙ্গলে। আসার সঞ্চার হল মনে, হয়তো এবার মিললেও মিলতে পারে। দুরু দুরু বুকে এগিয়ে চললাম আমরা।
জীপ কিছুটা এগিয়ে যেতে পিছন ফিরে দেখলাম, অনেকটা দূরে রাস্তার ওপর দুটি কালো মোরগ জাতীয় কিছু। এত বড় মোরগ? সন্দেহ হল। ক্যামেরার চোখ লাগাতেই চমক, এতো ময়ূরী! একটা না দু-দুটি। গলা উঁচিয়ে নামিয়ে রাস্তা থেকে খুঁটে খুঁটে কি যেন খাচ্ছে। আনন্দে নেচে উঠল মন। পশুকুল মুখ ফেরালেও পক্ষীরা তাদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত করেনি আমাদের।
হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল। হকচকিয়ে গেলাম কিছুটা। গাইড ফিসফিসিয়ে পাশের জাম গাছের দিকে দেখতে বলল আমাদের। ঘাড় ঘোরানোর সাথে সাথেই বিস্ময়! চোখের সামনেই বিরাট এক পক্ষীরাজ। সরু সরু লম্বা পোক্ত পায়ে জাপটে ধরে আছে গাছের ডাল। হাত দেড়েক লম্বা গাঢ় চকচকে নীল রঙের গলা। মাথায় ছোট ছোট নীল বিন্দুযুক্ত ঝুঁটি। বড় বড় টানা চোখের নিচে লম্বা সুগঠিত দুটি ঠোঁট। ধূসর পালক ঢাকা পাখনাদুটি নেমে গেছে শরীরের পিছন অবধি। নীলাভ সবুজ রঙের মায়াবী পেখমটি ঘাড় থেকে প্রায় হাত চারেক নিচে অবধি বিস্তৃত। বাদামি, নীল, সবুজ রঙা চোখ আঁকা পুচ্ছগুলিকে ঝুলিয়ে বসে রয়েছে গাছের ডালে। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছে আমাদের।
ক্ষণিকের বিরতি নিয়েই জীপ আবার এগিয়ে চলল। জঙ্গলের মাঝে কাঁটাওলা লোহার গেট পেরিয়ে একটি ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়াল সেটি। নেওড়া জঙ্গল ক্যাম্প। নেওড়া নদীর তীরে ছোট্ট একটি ওয়াচ টাওয়ার, আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের দুটি কটেজ। কটেজ লাগোয়া জমির জঙ্গল পরিষ্কার করে কিছু ফলের গাছ লাগানো। আম, জাম, সবেদা ইত্যাদি। আমাদের জীপ ছাড়াও আরো গুটিকতক জীপ দাঁড়িয়ে সেখানে। উৎসাহী কিছু পর্যটক ওয়াচ টাওয়ারে উঠে দেখার চেষ্টা করেছে দূরের জঙ্গলের ভেতর। ক্যামেরা তাক করে ছবি তুলে চলেছে পটাপট। কিন্তু তাদের মুখে কিছুটা হতাশার ছাপ। আমরা আর নামলাম না গাড়ি থেকে, সেখানে কিছুই না পেয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম পক্ষীরাজের দরবারে।
সবুজ ঘন জঙ্গলের একফালি অংশ ফাঁকা। বড় বড় ঘাস ও জংলী ঝোপে মোড়া। জায়গাটির মাঝবরাবর সরু একটি খাল বয়ে চলেছে কলকলিয়ে, মিলিয়ে গেছে অরণ্যের মাঝে। ঝিঁঝিঁ আর নাম-না-জানা কিছু পাখির একটানা ডাকের মায়ায় পরিপূর্ণ স্থানটি। জীপ এসে থামল সরু খালটির পাড়ে। গাইড নামার অনুমতি দিলেন। সবাই নামলাম, ঘুরে দেখতে থাকলাম জায়গাটা।
কাছে-দূরের গাছের ডালে বসে বেশ কিছু ময়ূর-ময়ূরী ব্যস্ত প্রেমালাপে। কেউ কেউ আবার নিচের জমিতে চরে বেড়িয়ে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে কিছু। আমাদের সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে যে যার নিজের মত কর্মশীল তাদের সকলে। সূর্যের নরম উষ্ণ আলোয় ঘন জঙ্গলের আড়মোড়া হয়ে ঘুম ভাঙার দৃশ্য অনবদ্য। প্রকৃতির শোভা আর ময়ূরদের সান্নিধ্যে প্রায় আধ ঘন্টা সেখানে কাটালাম আমরা। মন না চাইলেও ফিরতে হবে এবার, সারাদিনে আরও অনেক কিছু দেখার আছে..
গাড়ি স্টার্ট দিল, আমরা ফিরে চললাম রিসর্টে। যে পথ ধরে এসেছিলাম ফিরছি সেই পথ ধরেই। মন চাইছিল না এ দরবার ছেড়ে যেতে। মনে মনে বললাম, পক্ষীরাজ! আমি ধন্য তোমাদের মাঝে আসতে পেরে, তোমাদের সাথে কিছু সময় কাটাতে পেরে। আসি ময়ূররাজ, আসি ময়ূরীগণ। দেখা হবে আবার যদি কখনও আসি তোমাদের এখানে, ততদিন ভালো থেকো..
– সমাপ্ত –