অনেক বেড়ানোর গল্প হল, আজ একটু চেনা জায়গার কাহিনী বলতে ইচ্ছে করছে আপনাদের। অনেকেরই জানা আছে আমি আদতে মেদিনীপুরের এক অচেনা গ্রামের মানুষ। শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি; হয়তো এই বিবরণ কিছুটা একঘেয়ে লাগতে পারে আপনাদের। তবুও শিকড়ের টানে আজ আমার গ্রাম ও সংলগ্ন পরিবেশের কথা বলতে ইচ্ছে করছে।
যে গ্রামে আমি বেড়ে উঠেছি সেটির চরিত্র ও অবস্থান পারিপার্শ্বিক স্থানগুলির থেকে অনেকটাই আলাদা। মেদিনীপুরের (এখন যদিও পশ্চিম) একটি বেশ পরিচিত নাম ঘাটাল। ঘাটাল মূলত একটি একচিলতে প্রশাসনিক মহকুমা শহর। অধুনা অভিনেতা দেবের নামের সাথে জুড়ে যাওয়ায় পরিচিতি বা টি-আর-পি একটু বাড়লেও; ঘাটাল অনেকেরই পূর্বপরিচিত। তার কারণও অবিশ্যি কিছু কম নয়…
এক, আমাদের বন্যা; ফি বছর হওয়া চাই। কলকাতা যেমন ডেঙ্গুর পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে; বন্যাও তেমনই আমাদের। এবছর সব কিছু ছাপিয়ে শিলাবতী তার দুই পাড়কে প্লাবিত করেছে দু-বার। অক্টোবর মাসেও বন্যা দেখতে হচ্ছে এখন।
দ্বিতীয় কারণ অবশ্য বিদ্যাসাগর মহাশয়। ঘাটাল শহর ছাড়িয়ে আরও কিমি বিশেক দূরে ছিল ওনার পিতৃভূমি। বীরসিংহ। যথার্থই সিংহশিশু উনি। কলকাতা থেকে প্রায় শ-দেড়েক দূরের নিজের বাড়ি যাতায়াত করতেন পায়ে হেঁটে। সেই ইচ্ছাশক্তি আর এলেমকে শতপ্রণাম।
আরও একজন অবশ্যই ক্ষুদিরাম বোস। স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র এক যোদ্ধা এবং সর্বকনিষ্ঠ শহীদ। যিনি আমাদের মুক্তির কথা ভেবে হাসতে হাসতে সহযোদ্ধাকে বাঁচানোর জন্য ফাঁসির দড়ি পরেছিলেন। ক্ষুদিরাম জন্মের পর নিজের দিদির বাড়িতেই বড়ো হয়েছেন। মজলিশ পুর – শিমুলিয়া। ওনার দিদির বাড়ি আমার বাড়ির কিমি দুয়েকের মধ্যে পড়ে। দীঘির পাড়ের যে অশ্বত্থ গাছের ওপর থেকে উনি ঝাঁপ দিয়ে ইংরেজদের ডাক চুরি করে পড়তেন, সেই গাছ ইতিহাসের সাক্ষ্য বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে এখনও।
আরও কিছু আছে যা ঘাটাল বা এই অঞ্চলকে সমাদৃত করেছে, তবে সে প্রসঙ্গ আজ থাক। আজ আমি যে পরিবেশে মানুষ হয়েছি তার কথা বলবো।
আমার গ্রামের নাম সাগরপুর। ঘাটাল মহকুমার মধ্যে দাসপুর থানার অন্তর্গত একটি স্থান। আগেই বললাম, সাগরপুরের চরিত্র ও অবস্থান পারিপার্শ্বিক স্থানগুলির থেকে অনেকটাই আলাদা। চারটি স্কুল, দুটি ব্যাঙ্ক, একটি পোস্ট আপিস ও শ-তিনেক ছোট বড় দোকান মিলিয়ে বড় একটি বাজার যেখানে হাট বসে প্রতি মঙ্গল ও শনিবার। গ্রাম ছাড়িয়ে এটি ছোটোখাটো একটা শহরের আয়তন বিস্তার করেছে, অনেকটা পাহাড়ি অঞ্চলে যেমনটা হয়ে থাকে। বাজারটির সাথে প্রত্যক্ষ্য ও পরোক্ষভাবে জীবন জীবিকা জড়িয়ে আছে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষের। পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষজনও এই বাজারের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
আমার মা একবার শোনাচ্ছিলেন তাঁর বিয়ের গল্প, আমাদের বাড়ি আসার গল্প। বিয়ের দুদিন পরই বাবা মাকে ডিহিপলসায় মামাবাড়িতে রেখেই কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। সপ্তাহখানেক বাদে মা, সেই বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ী এসেছিলেন একাকী, রিক্সা করে, প্রায় পনেরো কিমি জঙ্গল পেরিয়ে। যিনি চালিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, উনি আমার দাদামশাইয়ের পরিচিত, মাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন। সেদিন আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন; ভয় পাসনি, যে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাব সেটি জঙ্গুলে হলেও বড় রাস্তার আধা সময়ে পৌঁছে যাব। তোকে রেখে সন্ধ্যের আগে আবার ওই পথেই ফিরতে হবে।
ভয়ের কারণ ছিল বৈকি! পথঘাট তখনও কাঁচা; গরুর গাড়ি চলে হাঁটু সমান কাদায়। সেগুলো শুকিয়ে গেলেও এতটাই এবড়ো খেবড়ো যে শক্ত করে না ধরে বসলে বাক্স-প্যাঁটরা সমেত পাশের খালে গিয়ে পড়তে হত। তার ওপর জঙ্গল এতো ঘন যে ভালো করে রাস্তা দেখা যায় না। এই জঙ্গলে সন্ধ্যের পর ডাকাত বেরোয় বলে উড়ো খবর মার শোনা ছিল। তাই ভয় সঙ্গে নিয়েই নিজের বাড়ি ছেড়ে মা এসেছিলেন আমাদের বাড়ি।
মার মুখে শুনেছি, সাগরপুর বাজার বলে যেটি এখন এতো জমজমাট জায়গা, সেদিন রিকশায় বসে দেখেছিলেন সেখানে কেবলমাত্র টিনের ছাদ বিশিষ্ট একটা আটচালাকে ঘিরে গুটি ছয় কি আটেক হাড়গিলে দেওয়াল দেওয়া দোকানঘর।
আমার জ্ঞানত অবিশ্যি দেখেছি খান পঁচিশেক দোকানঘর, দুটি স্কুল, একটি ব্যাংক আর হাট বসার দুটি বেশ বড় আটচালা জায়গা। সবচেয়ে বড়টিতে বসত একদিকে কাঁচা সবজি, পাশে চাল ও মশলা আর অন্যটিতে মাছের বাজার।
(ক্রমশ)