হয়তো কিছুটা এমনই আমার এই গ্রাম। না! লাল মাটির অবিশ্যি দেশ নয়, আগাগোড়া কালচে খয়েরি দোঁয়াশ মাটি এখানে। তিন ফসলি ফসলের সোনার আভায় ভরে থাকে বছরের অধিকাংশ সময়। তবু মোরামের লালচে পথের ওপরে ঝুঁকে পড়া কাশফুলের গাছের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু যখন রোদের আলোয় দ্যুতি ছড়ায়, সেই দৃশ্য অনন্য।
শরতের সকালে শিউলিতলায় ঝরে পড়া ফুলের সাথে পাতা থেকে চুঁইয়ে পড়া কনকনে সেই বিন্দুটির ছোঁয়া গিরিরাজের কাছে নিয়ে যায় যেন। কালো মেঘের ফাঁক গলে অবিরল বারিধারা যখন ধুইয়ে নিয়ে যায় পথ ঘাট; মোরামের লাল ধোয়া জল মেশে যখন পুকুর ঘাটের কালচে জলে – তখন কেমন যেন উদাস করে দেয়। ভেসে যেতে ইচ্ছে করে ওদের সাথে। ধূসর কুয়াশার কনকনে শীতে, জড়ো করা আধোভেজা বাঁশপাতার আগুনে হাত সেঁকে ধোঁয়ামাখা গায়ে বাড়ি ফেরার উপলব্ধিটাই অন্যরকম।
সাগরপুরের মোট লোকসংখ্যার এক চতুর্থাংশ (মূলত পুরুষেরাই) কর্মসূত্রে থাকেন দেশের বিভিন্ন শহরে, তাঁদের বেশিরভাগই যুক্ত স্বর্ণশিল্পের সাথে। গ্রামের বাকিদের মূল জীবিকাই হল চাষবাস। এছাড়াও গুটিকয়েক লোকজন যুক্ত আছেন সরকারি চাকুরি আর নিজস্ব ছোট ব্যবসায়। গ্রামের মহিলারা চাষবাসে সাহায্য করার পাশাপাশি যুক্ত বিভিন্ন সেলফ-হেল্প গ্রুপের সাথে।
সময় বদলায়, সাথে স্থানও; তাই এখন আধুনিকতার পরত লাগলেও আমার গ্রামের কঠিন সময়ের কিছুক্ষণের সাক্ষী থেকেছি আমিও। একটা সময় ছিল যখন আধপেটা খেয়ে মানুষ “আচ্ছে দিন” -এর আশায় দিন গুনেছে। নাহঃ “আচ্ছে দিন” অবিশ্যি আসেনি এখনও। সময়ের চিত্রপট থেকে মসনদ সব কিছু বদলে যায় কিন্তু মানুষের দুরবস্থা তাদের নিজেদেরই পরিবর্তন করতে হয়। কোনো মন্ত্রবলেই কেউ সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেনি, আর করবেও না কখনও।
আমি নিজের চোখে দেখেছি দারিদ্র্য কাকে বলে… দেখছি, আমার সহপাঠী বন্ধুরা পঞ্চম শ্রেণীর গন্ডি পেরোনোর আগেই নিজের ও পরিবারের তাড়নায় কিভাবে চলে গেছে দূর শহরে। দেখেছি, রাজনীতির ভালো মন্দের যাঁতাকলে পড়ে কিভাবে সময় কাটাতে হয়েছে দুস্থ মানুষগুলিকে। কোনও অভিযোগ নেই আমার কারও ওপর কারণ আমি জানি আমার ভাগ্য বদলাতে নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে। আমার সহপাঠীরা হয়তো সেই উপলব্ধি করে চলে গিয়েছিল আগেই…
কে ভালো কে মন্দ তার বিচার করার আমি কেউ নই। সময় থেমে থাকে না কারও জন্য; আগে কি ছিল এখন কি আছে সেই তুলনাতেও যেতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে পারি চেষ্টাটা ২০-২৫ বছরের, তাই পূর্বতনের কিছু ভিত্তি নূতনদের কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে মাত্র। আর তাছাড়া নিজেদের ভালো থাকার প্রচেষ্টা অনেকটা পরিবর্তন করেছে পরিবেশের। এই অবস্থাটা আশেপাশের সমস্ত জায়গার। আগেই বলেছি এস্থান অন্যদের থেকে একটু আলাদা তাই হয়তো প্রতিফলনটা চোখে পড়ছে বেশি।
সাগরপুর নামটা ঘাটাল বা আশেপাশের মহকুমায় বেশ পরিচিত। কারণ হিসেবে বলতে গেলে এখানকার মানুষজন একটু বেশি সংস্কৃতি সচেতন। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা এবং নৃত্য – সঙ্গীতচর্চায় পারদর্শী।
(ক্রমশ)