মাঝে মাঝেই ভারাক্রান্ত মনে উঁকি দেয় পুরানো সব স্মৃতি। ছোটবেলার সেই স্মৃতিমালা আজও অমলিন হয়ে গেঁথে আছে মনিকোঠায়। মা-ঠাকুমার থেকে কিছু শোনা কথার সাথে কিছুটা নিজেরও উপলব্ধি ভিড় ঠেলে আসতে চায় ওপরে। এই সিরিজে আগেই লিখেছি ঘাটাল মহকুমার সামগ্রিক পরিবেশের টুকিটাকি। অজপাড়াগাঁয়ের মেঠো পথে ঘুরে আসতে ইচ্ছে করছে আজ। চলুন, একটু সময়-ভ্রমণ করা যাক।
গ্রামীণ পরিবেশের সাথে যাদের একটুও পরিচিতি আছে তাদের বুঝতে কিছুটা সুবিধে হতে পারে। কথ্য ভাষা যেমন প্রতি ২০-২৫ কিলোমিটারে তার চরিত্র বদলায়। ঠিক তেমনই আচার-ব্যবহার এবং বাসস্থানও তার চরিত্র বদলায় ক্ষেত্র বিশেষে। প্রত্যন্ত মেদিনীপুরের ঘরবাড়ির আদলেও যে বিশেষত্ব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। ঠিক যেমন, আমার দাদামশাইয়ের ব্যবহৃত বাড়ির গড়ন ছিল ঠাকুরদার তৈরী বাড়ির থেকে আলাদা।
বাইরে থেকে দেখে একটিই বাড়ি মনে হলেও, আসলে বাড়িগুলি ছিল মূলত দুই অংশে বিভক্ত। সামনের অংশে, এক বা একাধিক কামরা যুক্ত গোলা এবং সেটি লাগোয়া থাকার ছোট্ট একটি বা দুটি ঘর। মূলত পরিচারক বা চাষের সহকারীদের বসবাসের জন্য এগুলি ব্যবহৃত হত। তার পাশেই থাকত ঢোকার মূল দরজা বা ফটক। গোলা এবং পরিচারকদের ঘরের মাঝামাঝিও মূল ফটক থাকত ক্ষেত্রবিশেষে।
ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলে, গোলা ও সংলগ্ন ঘরটির লাগোয়া বারান্দা এবং তারপর থাকত একটুকরো ফাঁকা স্থান বা দালান (যেটিকে স্থানীয় ভাষায় ‘বাইর’ বলে)। দালানটির তিন পাশের একদিকে স্নান ও রান্নার ঘর, অন্যদিকে ঠাকুরবাড়ি, এবং পিছনে বড় অংশে থাকার ঘরগুলি। পুরো বিষয়টি একটি বাউন্ডারির মতো করে বানানো। অর্থাৎ ফটকটি ভেতর থেকে বন্ধ করা থাকলে পুরো বাড়িটি থাকত সুরক্ষিত। ঠাকুরদার মুখে শুনেছি, আগে নাকি খুব ডাকাত পড়ত এদিকে। তাই প্রায় সবাই এইভাবেই বানিয়েছে তাদের বাসস্থানগুলি। যাতে মূল দরজা ছাড়া কেউই প্রবেশ করতে না পারে ভেতরে এবং সুরক্ষিত থাকতে পারে ঘর-বাড়ি মানুষজন ও গোলার ফসল।
কৃষিপ্রধান গ্রামে প্রায় সকলের বাড়িতেই গবাদি পশু থাকত সেসময়। চাষ দেওয়ার বলদ ছাড়াও দুধের চাহিদা মেটাতে গাই গরুও থাকত একাধিক। চাষের উচ্ছিষ্ট প্রায় সবকিছুই গরুর খাবার হিসেবে কাজে লেগে যেত। গোশালাগুলি বানানো হত বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে খামার লাগোয়া। গরু ছাড়াও লোকে পুষতো বিড়াল, কুকুর, টিয়া, পায়রা ইত্যাদি। ছোটবেলায় দেখেছি বেশ কিছু হাঁস ছিল আমাদের। রোজ সকালে সারি দিয়ে চরে বেড়াত পুকুরে আর বিকেল হলেই নিজে থেকেই এসে ঢুকে পড়ত তাদের বরাদ্দ ঘরে। অনেক কাজের মধ্যে আমার একটা ছিল সকালে উঠে খুঁজে বার করা, কোন ঘরে ডিম দিয়েছে তারা।
সেই সময়ের সংলগ্ন অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষজনের জীবন-জীবিকা ছিল কমবেশি প্রায় একই রকমের, তাই একটু ব্যক্তিগত দিকটাই তুলে ধরছি এখানে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বেশ কিছু জল ও বাস্তু জমি ছিল ঠাকুরদার। খুবই সাধারণ মানের জীবন যাত্রার মধ্যে চলাফেরা করত বাড়ির সবাই। ঠাকুরদার মূল জীবিকা ছিল চাষবাস। এছাড়াও ফাঁকা সময়ে আরও টুকটাক কাজ করতেন উনি। ঠাকুমার থেকেও শুনেছি তাদের সেকালের অনেক গল্প। জেনেছিলাম, রবিফসল ছাড়াও প্রায় সব রকমের চাষবাস হত জমিতে। আমি অবিশ্যি প্রতক্ষ্য করতে পেরেছি শুধুমাত্র ধান, পাট, বিভিন্ন রকমের ডাল, তিল ও সরষে চাষের।
তিন ফসলী জমি খালি থাকত না কখনও। প্রতি ঋতুই উজাড় করে দিত তাদের রত্নভাণ্ডার। পুকুর ভরা মাছ, গাছ ভরা আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, এমনকি তেঁতুল, তাল, নারকেল এবং খেঁজুরও। এমন কিছু নেই যা হতনা সেসময়। অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও সচ্ছল ছিল পরিবারগুলি, কারণ মানুষজনের চাহিদাও কম ছিল। যাদের তুলনামূলক জমির পরিমান কম ছিল বা একেবারেই ছিল না, তারা ভাগচাষ বা চাষের সহযোগী হিসেবে কাজ করে জীবনধারণ করত সেসময়।
ঠাকুমার মুখে শুনেছিলাম, ঠাকুরদার অনেক পরিচিত ও বন্ধুদের আসা যাওয়া লেগেই বাড়িতে। এছাড়াও চাষের কাজের সহযোগীরা তো ছিলই। বাড়ি নাকি গমগম করত প্রায় দিনই। বাড়ির সদস্যরা ছাড়াও প্রায় জনা বিশেক মানুষের রান্না চড়ত প্রতিদিন। দুপুরের রোদ্দুরের তাপ কমলে পান চিবোতে চিবোতে বাড়ি মুখো হতেন সকলে। ঠাকুরদার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রবি চাষের পাট একপ্রকার উঠেই যায় আমাদের। কারণ শুধু বয়স ছিল না। আর ছিল অবিশ্যি নতুন প্রজন্মের অনীহা এবং প্রকৃতির পরিবর্তন সাথে জলের অভাব।
রেডিও নামক যন্ত্রটিই ছিল তখন বাইরের জগতের মধ্যে যোগাযোগ ও বিনোদনের প্রধান অবলম্বন। যাত্রাদল ছিল সর্বজনগ্রাহ্য বিনোদনের আর একটি উপায়। আর ছিল পটচিত্র; ছোটবেলাতে দেখেছি পট (পটচিত্র) খেলা। গল্পের ছলে, ছবির মাধ্যমে পৌরাণিক গাথাগুলিকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলতেন শিঁল্পীরা। অনেকবার দেখেছি সেই খেলা। মাঝে মাঝে পুতুল খেলার আসর বসত বিভিন্ন জায়গায়। সেখানেও ভিড় হত দেখার মত।
আমাদের গ্রামে দুর্গোৎসবের থেকেও জমাটি হয় লক্ষী পুজো। আশেপাশের ১০-১২টি গ্রামের বাজার-হাট তখনও বসত এই গ্রামেই। লক্ষীপুজোর প্রচলন সেই থেকেই। দিন পাঁচেকের মেলা বসত সে সময়েও। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে দিন তিনেক ধরে হত যাত্রানুষ্ঠান। গ্রাম উজাড় করে মানুষজন আসত যাত্রাপালা দেখতে। আর হত শীতলা (স্থানীয় ভাষায় ‘মায়ের পুজো’) পুজোয়, এবং কখনওবা শিবের (‘বাবার পুজো’) গাজনে। অতি অল্পের এই বিনোদনেও খুশি থাকত সকলে।
সময়ের সাথে সবকিছুরই পরিবর্তন হয়। ছোটবেলার সেই পরিবেশ হারিয়ে গেছে কবেই। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে গ্রাম্য জীবনে। হয়তো প্রয়োজনও আছে তার। তবুও ইচ্ছে করে, টুক করে ঢুঁ মেরে আসি পুরানোর পাতায়। ফিরে যাই তালতলার মাঠে লাটাই হাতে বা লাফ মারি ‘ধিতিঙ্গা’-র সেই বিলে। তাই যেন ‘প্রফেসর রণ্ডির টাইম মেশিন’ -এর অপেক্ষায় বসে আছি আজও…
(ক্রমশ)