অসমাপ্ত – ৪

Abokash > Blog > অসমাপ্ত – ৪
পুতুল লিবে নাকি খোকাবাবু..!

আজকের লেখাটা একটু পুরানো। সময়ের অভাবে সম্পূর্ণ করতে পারিনি তখন। ডাইরির পাতা ওল্টাতে গিয়ে হঠাৎ সামনে এসে পড়ায়, ধুলো ঝেড়ে আবার লিখতে বসলাম। প্রথমের অংশটির অবিকৃত প্রতিকৃতি তুলে ধরলাম এখানে। যদিও পরের ভাগে সংযোজন থাকবে আদি ও নব্যের স্মৃতি থেকেই।

বৃষ্টি, খুব একটা পছন্দের নয় আমার। বেশ কিছু কারণ অবিশ্যি এর জন্য দায়ী। তাই, রোদ ঝলমলে দিনই প্রত্যাশার ওপরে থাকে সবসময়। তার সাথে যদি পাওয়া যায় হিমের পরশ, তো ব্যাপারটায় অন্য মাত্রা যোগ হয়। অনেকে আমার সাথে একমত নাও হতে পারেন। যার যেটা পছন্দ! তবে মাঝে মাঝে বৃষ্টির জন্য মন যে কেমন করে ওঠেনা তা কিন্তু নয়। প্রাণের মাঝে স্রোতের বিচরণের মতোই একঘেয়েমি দূর করতে কয়েক পসলার দরকার হয় খুবই।

১৪ই জুলাই ২০১৮, শনিবার

দিনটিকে তারিখ সহ তুলে রাখার কারণটা ক্রমশ প্রকাশ্য। আজ শুভ রথযাত্রা। ছোট বেলা থেকেই রথযাত্রার দিন বৃষ্টি হয়, শুনে বা দেখে এসেছি। আজও তার অন্যথা ঘটেনি। ঘটনাক্রমে আজ মেদিনীপুরের বাড়িতে বসে এই লেখা লিখছি। শুধু লিখছি বলা ভুল হবে, কিছু আবেগকে ভাষায় প্রকাশ করছি হয়তো। বৃষ্টির যে এতো টান আর ভালোলাগা থাকতে পারে তা আগে কখনও খেয়াল করিনি। বৃষ্টিকে অনেকে অনেক রকমভাবে উপভোগ করেন। এতদিন আলসেমি আর খিচুড়ি-বেগুনভাজায় উপভোগ করতাম কিন্তু আজ একটু আবেগঘন হয়ে পড়েছি যেন। কিছু ঘটনারা ভিড় জমিয়েছে এই বৃষ্টি মুখর সন্ধ্যায়। তাদেরই রোমন্থন করছি একটু অন্যভাবে।

টিনের চালা দেওয়া বাড়িতে বসে মুসল ধারার বৃষ্টির গান শুনেছেন কখনও…? না শুনে থাকলে চেষ্টা করতেই পারেন। নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি, সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

তা সে যাইহোক, রথের দিনের প্রথা মতোই যেন আজ সন্ধেতেও আকাশ ভেঙে পড়েছে মাটিতে। ঈশান কোনে আলোর ঝলক দেখেই পাততাড়ি গুটিয়েছে WBSESCL। হারিকেনের টিমটিমে আলোয় দোল খাচ্ছে নিজেরই কালো প্রতিচ্ছবি।”

৩০শে  জুন ২০২০, মঙ্গলবার

প্রায় বছর দুয়েক কেটে গেছে ইতিমধ্যেই। আজ অবিশ্যি উল্টো রথ। যদিও উৎসবের আনন্দ আর নেই এখন, নিরাশা ও অবিশ্বাস ছেড়ে রয়েছে চারপাশ। নাহঃ বৃষ্টি হয়নি এবার, রথের দিনেও না। আগের বৎসর ঠিক এমনই ছিল, বৃষ্টিহীন ভ্যাপসা গরম। তবে নগর ভ্রমণ আটকে ছিল না জগন্নাথ দেবের। যদিও দড়িতে টান পড়েনি এবার। উনিও নিরুপায়, কব্জি বিহীন হাতে নিজের রথ নিজেও টানেননি উনি। ভক্তরাও সিঁটিয়ে খুদে মাস্তানের ভয়ে। নাম তার করোনা। অশরীরী এই জীব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র, নিজের মর্জিতে। এক অঘোষিত “কোরোনা” -তে ছেয়ে রয়েছে চারপাশ।

রথ বললেই আজও ভেসে ওঠে ছোট্ট এক টুকরো স্মৃতি! কাকুর কাঁধে চড়ে দুই ভাই গিয়েছিলাম অজানা এক স্থানে। কত লোকের আনাগোনা সেখানে। রঙীন জামাকাপড় পরে খোলা মাঠে ভিড় জমিয়েছে আবাল-বৃদ্ধের দল। ঘুগনী-জিলিপি-পাঁপড়ের গন্ধে ম-ম করেছে তখন চারপাশের বাতাস। অচেনা ভাষায় গান বেজে চলেছে গাছে বাঁধা মাইয়ে। কখনও তাকে ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে ডুগডুগি আর ভেঁপুর আওয়াজ। ঘড়ঘড় শব্দে হাতে টানা কাঠের নাগরদোলায় দোল খাচ্ছে কিছু ছেলে মেয়ের দল।

ভিড় বাঁচিয়ে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আমরা। অদূরের কোলাহলের পিছন থেকে ভেসে আসছে – “এই…ঘুগনী, ঘুগনী! খুকুমনির ইস্পেশাল ঘুগনী… আটানা, আটানা !! ডিম চারানা….” “এই…বেলুন… লাল, নীল, হলদা বেলুন – দশ পয়সা, বাঁশি পাঁচ…” “এদিকে, এস! নাগরদোলা, নাগরদোলা…” “ঝিলাপি লিয়ে যাও গো… গরম ঝিলাপি, বারো টাকা সের…!! … …” মিটিমিটি চোখে এদিক ওদিকের রঙ্গ দেখছি ভ্যাবলা মুখে।

“পুতুল লিবে নাকি খোকাবাবু…!” কথাটা খুব সামনে থেকে কেউ বলে উঠতেই চমকে তাকালাম সেদিকে। খোঁচা খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ির মাঝে কালো দাঁতের সারি বের করে আমার দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে একটি লোক। লিকলিকে লম্বা বাড়ানো হাতে ধরা একটি মাটির পুতুল। মাথায় লম্বা উস্কোখুস্কো চুল, চোখগুলি কোটরে ঢোকা। গায়ে, রংজলা ঢোলা জামা। বুক পকেটের একপাশটা ছেঁড়া। আধখাওয়া একটা বিড়ি উঁকি মারছে সেখান থেকে। কোমরের অমলিন ধুতি শেষ হয়েছে হাঁটুর ওপরেই। তামাটে সরু পা দুটি ঢাকা কাদামাখা ক্যাম্বিসের জুতোয় । কাঁধের ধুলো মাখা জীর্ণপ্রায় একটি ঝোলা, আকারে বেশ বড়।

চুপকরে থাকতে দেখে, খিক খিক করে হেসে আবার সুধায় – “পুতুল লিবে খোকাবাবু…?” পরক্ষনেই, ধপাস করে ঝোলাটা মাটিতে ফেলে আরও খান পাঁচেক পুতুল বের করে সে। ভয়ে সিঁটিয়ে কাকুর পায়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ি দুজনেই। কাকু হেসে দুজনকে সামনে বের করে নিয়ে এসে কিনে দেয় দুটো পুতুল। প্রথম মেলায় কেনা সে পুতুল আলমারীর কোন থেকে উঁকি দেয় আজও…

মেঘের কোলে গুড়গুড় শব্দে গুঞ্জন থমকে যায় অল্পক্ষন। আকাশের দিকে একবার চেয়েই আবারও হুল্লোড়ে মেতে ওঠে সকলে। আমরা ঘুগনী- জিলিপি খেয়ে পা বাড়াই বাড়ির উদ্দেশে। হঠাৎ হ্যাঁচকা টানে কাকুর হাত ছেড়ে যায়। কোথা থেকে যেন একদল লোক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় জমাট বাঁধা লোকজনকে। ধাক্কা সামলে উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, দল বাঁধা লোকরা কিছু যেন একটা টেনে আনছে এদিকে। ইয়া মোটা লম্বা একটা দড়ির শেষ প্রান্তে ছোট্ট চলমান একটি বাড়ি। খোল-কাঁসর-খঞ্জনী বাজিয়ে হরি নাম সংকৃত্তনের বোল সমেত এগিয়ে আসছে সামনে। জয় জগন্নাথ! জয় বলরাম! জয় সুভদ্রা! ধ্বনি উঠছে থেকে থেকেই। কি ওটা? হ্যাঁ, ওটাই আমার প্রথম দেখা রথ।

ফুল, মালা দিয়ে সাজানো উঁচু একটি মন্দির। কিছু পুরোহিত চড়ে বসেছে পাটাতনে, কিছু আবার চূড়ায়। দড়ির টানে এগিয়ে আসার সাথে সাথেই তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে গুড় বাতাসা, জিলিপি, খাড়ি, গজা। পথের দুধারের লোকজন ভক্তিভরে কপালে ছুঁইয়েই মুখে চালান দিচ্ছেন সেগুলি।

ভাগ্যে না জুটলেও পেন্নাম ঠুকে চোখ খুলতেই, কাকু খপ করে ধরে নিল ছেড়ে যাওয়া হাতটি। সেই সঙ্গেই আবার পা বাড়ালাম বাড়ির উদ্দেশে..

 

(ক্রমশ)

Teracotta idols- Abokash images
আমাদের প্যাকেজ ট্যুর

Leave a Reply

Proceed Booking