অসমাপ্ত – ৬

Abokash > Blog > অসমাপ্ত – ৬
ছন্দহীনা তিলোত্তমা

আইটি সেক্টরে কাজ করার দরুন “ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম” -এর সাথে পরিচয়টা সেই ২০১৫ থেকেই। এখন যে এমএনসি -তে কাজ করি তাদের অবিশ্যি ব্যাপারটা নতুনই। কলকাতায় করোনার করাল থাবা তখনও না পড়লেও, আসেপাশের হাঁচি-কাশির শব্দে সকলেই উট পাখির মতো ঘাড় উঁচিয়ে এমন ভাবে তাকাতে শুরু করেছে যেন ভিন গ্রহের কেউ এসে পড়েছে অফিসের ভেতর। করোনার জেরে আমাদের সংস্থাটি তাদের পুরানো প্রথা ভেঙে বাড়িতে কাজের দিকেই এগোচ্ছে তখন। যদিও আগে থেকেই এই বিশেষ সুযোগটি পেতাম আমরা; তা সত্ত্বেও পাকাপাকি বাড়িতে কাজের অনুকূল-প্রতিকূলতাকে যাচাই করতে ১৯-শে মার্চ ২০২০ স্থির হল “ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম”। তখনও জানা ছিল না যে, প্রথমে ১ দিনের প্রতীকী জনতা কার্ফু, পরে রাজ্য সরকারের ৩ দিন, এবং তারও পরে ভারত সরকারের ২১ দিনের লকডাউন পর্যায়বৃত্ত ভাবে আসতে চলেছে। যাইহোক, সেই হিসেবে দেখলে ঘরবন্দি দশা শুরু আমার ১৯-শে মার্চ থেকেই।

সাপ্তাহান্তের ল্যাদ খাওয়া সেরে বাজারের থলে হাতে বেরোতে কোনও দিন ১১ টা, আবার কোনও দিন ১২টা হয়ে যায়। চেনা বিক্রেতারা জানেন যে তাদের উদবৃত্ত ও উচ্ছিষ্টগুলি ব্যাগস্ত করে নিয়ে যাবার অন্তত একটা লোক আসবেই। কিন্তু ২১-শে মার্চ বাজারে গিয়ে চক্ষু চড়ক-গাছ। প্রতীকী লক-ডাউনের ঘোষণা হয়ে গেছে আগের দিন রাত্রেই। সবে তখন পৌনে ১০টা, এতো “ভোরে” বেরিয়েও দেখি বেলা ৩-টে অবধি বসে থাকা বিক্রেতারা পাততাড়ি গোটাতে ব্যস্ত। একগাল হাসি নিয়ে বলে দিলেন – “আজ আর কিছু হবে না দাদা”। কি আর করি, অগত্যা গন্তব্য ভুষিমাল বাজার। গিয়ে দেখি, সেখানেও প্রতিটি দোকানে কমকরে ৫০ জনের লম্বা লাইন। তায় আবার, চাল নেই, আটা নেই, তেল নেই, মশলাপাতি নেই। বাজারে মাছ নেই, দুধ নেই, শাক নেই, সবজি নেই, এমনকি রোজকার উদবৃত্ত কাটা-পোকা আলুগুলো পর্যন্ত নেই!!! অবাক কান্ড; লকডাউনতো মাত্র একটি দিনের জন্য, তবে একদিনে কত খাবে মানুষ?

৩০-শে মার্চ ২০২০, সোমবার

টানা ১১ দিন ঘরবন্দী থাকার পর বাইরে বেরিয়ে মনে হচ্ছিল, ১০ বছর পর জেল থেকে ফিরেছি যেন। নাহঃ হাওয়া খেতে বেরোইনি মোটেই, এতটাও দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাববেন না। মেডিক্যাল এমার্জেন্সি এসে যাওয়ায় বন্দিদশা কাটিয়ে তড়িঘড়ি ছুটতে হয়েছিল ডাক্তার মহাশয়ার ডাকে। এখানে বলে রাখি আমাদের এই অংশটি বিধাননগর কমিশনারেটের আওতায় পড়ে। দিনে কমকরে বার দশেক বা তারও বেশি টহল দিয়ে যায় বিধাননগর পুলিশ আবার কখনও কলকাতা পুলিশ। লাঠি নিয়ে তাড়া করতে অবিশ্যি দেখিনি কখনও তবে সকাল-সন্ধ্যায় শুনিয়ে যান সতর্কবাণী।

একটু আশঙ্কা হাতে নিয়েই বেরোলাম। পাড়ার মোড়ে দেখা মিলল এক কনস্টেবল ও একজন ট্রাফিক গার্ডের সাথে। চড়া রোদ্দুর থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছেন তখন অস্থায়ী মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের সহায়তা কেন্দ্রের ভেতর। এগিয়ে গেলাম ওনাদের কাছে। অনুমতিও মিলল তৎক্ষণাৎ। বাড়ি থেকে গ্যারাজ মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। মনুষ্যশূন্য পথের মাঝে ইতস্ততভাবে শুয়ে কিছু সারমেয়। পায়ের শব্দে মুখ তুলে চাইল বার কয়েক।

সবে মাত্র সাড়ে নটা, ভরপুর অফিস টাইম। এসময় গাড়ির হর্ণে কান পাতা দায় হয়ে যায় এই রাস্তায়। রিক্সা-অটো-বাস-ভ্যান ছাড়াও বাইক, সাইকেলের ও মানুষজনের দাপটে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এ পথ। সেই পথ এখন একাকী হয়ে পড়ে রয়েছে সুউচ্চ ইমারতগুলির ফাঁক গলে। মানুষজনের দেখা নেই কোথাও। কত গল্প, কত দুঃখ-হাসি-কান্না-কোলাহল-রাগ-অভিমান কুন্ডলি পাকিয়ে পাড়ি দিত ধোঁয়া-ধুলোর সাথে মেঘের দেশে। আজ যেন নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে শবের মতো।

কংক্রিটের জঙ্গল পার করে একটু এগোলে আসে প্রাচীর ভাঙা এক পুরানো কারখানা। এ চত্বরে কাটিয়ে ফেললাম প্রায় বছর দশেক। যৌবনে এই কারখানাটি থেকে যে কি উৎপাদন হত তা আজও অজানা। কারখানার রুগ্ন দেওয়াল ধসে পড়েছে বছর দুয়েক আগেই। তার ফলে ভেতরের আগাছার মাঝেই দেখা যায় পুরানো গাছেদের সারি। আম-কাঁঠাল-নারকেল-খেজুর-শিমুল-পলাশের মাঝে একটা চিনার। দিনে কমকরে বার চারেক মাড়াতেই হয় এ পথ। বৃষ্টি ভেজা দিনেও এতো সতেজ দেখিনি কখনও গাছগুলিকে। আজ যেন আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে তাদের পাতা-ফুল-ফল থেকে। সবুজের মাঝে লাল পলাশ আর চিনার গাছের হলুদ কমলা পাতা শোভিত করছে পথের একপাশ।

কালো পিচের রাজপথটি যেন অনেক বেশি চওড়া হয়ে গেছে এই ক দিনেই। হুস হুস শব্দে ঝড়ের গতিতে মাঝে মাঝেই ছুটে চলে যাচ্ছে দু-একটি সাদা গাড়ি। কিসের ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে তড়িঘড়ি ছুটে পালতে ব্যস্ত যেন তারাও। শুকনো পাতার দল ইতস্তত ছুটে বেড়াচ্ছে কখনও ছুটন্ত গাড়ির টানে, কখনও দমকা হাওয়ায়।

খাঁ খাঁ রোদ্দুরের মাঝেই ছুটে চললাম গন্তব্যের দিকে। সমস্ত সিগন্যাল খোলা। কিছুটা দূরে, পথ আটকে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ। বিষণ্ণ ও ক্লান্ত মুখে তাকিয়ে আমাদের দিকে। জরুরি কাজে বেরিয়ে আটকে পড়েছে বোধহয়; অপেক্ষা করছে অতি সীমিত চলা কিছু বাসের। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। রাস্তা পার হতে হবে এবার। গতি কমিয়ে বাঁক নিতেই পথ আটকে দাঁড়াল ট্রাফিক গার্ড। কারণ দর্শাতেই রাস্তা উন্মুক্ত হল আবারও।

কাজ মিটতে লাগল প্রায় ঘন্টা তিনেক। বেলা গড়িয়েছে অনেকখানি, আপিসের বেশ কিছু কাজও পড়ে আছে। তড়িঘড়ি ছুটলাম বাড়ির পথে। চওড়া ভিআইপি রোডে শেষ প্রান্তে বসে কিছু ফলওলা, গরম তাড়াতে তারা ব্যস্ত হাতপাখায়। ইচ্ছে থাকলেও সাহস হল না কিছু কিনতে তাদের কাছে যাওয়ার। সবই সেই অদৃশ্য ছোট্ট জীবটির জন্য। তার ক্ষমতা অসীম। এক লহমায় সে ছেদ টেনে দিতে পেরেছে সমস্ত ধর্মীয় ভেদাভেদ, হিংসা-হানাহানি, জাত-পাত, ধনী-গরিবের বিভেদ, রাজনৈতিক কূটকচালি, অর্থলিপ্সা, অনৈতিকতা এবং আরও অনেক কিছুর। ভেঙে দিতে পেরেছে মানুষের অহংকার। প্রমান করে দিতে পেরেছে, ক্ষমতা খুবই তুচ্ছ। সবার ওপরে প্রকৃতি; তাকে বশ করতে নয় সম্মান করতে হয়। নইলে মৃত্যু অবধারিত।

এ কোন শহর? যেখানে জনস্রোত নেই, উচ্ছাস নেই, পথ-ঘাট শূন্য, যানবাহন নেই, বাজার-হাট খালি, যদিওবা কিছু মানুষজন আছেন, তারাও বাড়ি মুখো এবং সকলেই ভীত, সন্ত্রস্ত। একে অপরকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখতে ব্যস্ত। মানুষই এখন মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আতঙ্ক যেন মজ্জাগত হয়ে গেছে সবার। এই বুঝি অযাচিত ভাবেই এসে পড়ে মৃত্যুর পরোয়ানা। তবে মৃত্যুর আতঙ্কই যেন মৃত্যুর থেকেও বড় এখন। তাই আস্ত এক প্রানোচ্ছল শহরকে বশ করে নিয়েছে কেউ।

পথের দুই ধারে সুউচ্চ ইমারতগুলি দাঁড়িয়ে সারিবদ্ধ ভাবে। কোনটির ব্যালকনিতে উড়ছে শুকোতে দেওয়া ভেজা কাপড়, কোনোটির থেকে উঁকি মারছে উজ্জ্বল বেগুনী ফুল। প্রতিটি কোটরে অনেকগুলি প্রাণ যেন টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত নিজেদেরকে। “মঙ্গলই স্বর্গ” -র মতো অপার্থিব নিস্তব্ধতা গ্রাস করে রেখেছে চারিপাশ। সময় গুনছে যেন কিছুর অপেক্ষায়।

এ আমার চেনা শহর নয়। এ শহর আমার হতে পারে না! মহানগরীর শরীর বেয়ে চলতে চলতে বার বার এই কথাই ভিড় করছে তখন মাথায়। মনে হচ্ছে  – “হাঁটছি এখন মৃত শহরের ওপর দিয়ে।”

 

(ক্রমশ)

A loanly man watching the city from rooftop under the red sky from WallpaperFlare - Abokash
আমাদের প্যাকেজ ট্যুর

Leave a Reply

Proceed Booking