অসমাপ্ত – ৮

Abokash > Blog > অসমাপ্ত – ৮
রক্তে আমার ইনকিলাব!

নাহঃ ‘কমুনিস্ট’ আন্দোলন অথবা বিপ্লবের গুরুগম্ভীর আলোচনা করার মতো শিক্ষা, যোগ্যতা বা অভিপ্রায় আমার নেই। দেশীয় বা স্থানীয় স্বার্থের থেকে আদর্শেকে প্রাধান্য দিয়ে বিদেশের প্রসঙ্গ টেনে আনাও আমার উদ্দেশ্য নয়।। সে ‘জাতে’ ওঠার ক্ষমতা বা বাসনাও হয়তো নেই। এটি একান্তই নিম্ন-মধ্যবৃত্ত পরিসরের  ছাপোষা, একেবারেই গ্রাম্য জীবনশৈলীর স্মৃতিচারণ মাত্র।

প্রয়োজনাতিরিক্ত -তো দুরঅস্ত, অতি প্রয়োজনীয় জিনিসই যখন জীবন ধারণের জন্য অপ্রতুল হয়ে পড়ে, সর্ব-চেস্টার পরও যখন তার ধরে কাছে পৌঁছাতে পারা যায় না, অথচ অদূরেরই “কেউ” কি ভীষণ অবলীলায় সেগুলি নিয়ে লালিত-পালিত হয়, তখনই হয়তো অগোচরেই কিছু প্রশ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে মনে। পরে পরে সেটিই হয়তো সাহস যোগায় সোজাসুজি প্রশ্ন করার। যা সহজলোভ্য হয়নি কখনও, যা অতি কষ্টার্জিত তার অবহেলা হলেই বাঁধে সংঘর্ষ। এ যেন মজ্জাগত বা  হয়তো দেবোত্তরও হতে পারে।

প্রাচুর্যের মোহ কোথায় নিয়ে যেতে পারে তা এখন টিভি খুললেই বা মোবাইলের পর্দায় আকছারই দেখা যায়। নব্য সংযোজন বোধহয় “প্রিন্স খান”। এ তালিকা মোটেই ক্রমহ্রাসম্যান নয় বরং উল্টোটাই। আজকের প্রসঙ্গ অবিশ্যি একটু আলাদা। যাইহোক, ফেরা যাক ‘ইনকিলাব’ -এর কথায়।

সময়টা ১৯৯৮-৯৯। প্রাথমিকের ঘেরাটোপ পেরিয়ে সদ্য পা দিয়েছি বড়দের স্কুলে। নুতন স্কুল, নুতন শিক্ষক, নুতন পরিবেশ। আনন্দ ও ভয় মিশ্রিত অনন্য-অদ্ভুত সে এক অভিজ্ঞতা। আশেপাশের অনেক স্কুলের ছেলেরাও ভর্তি হয়েছে আমাদের এই স্কুলে। তাদের সাথে, তাদের পাশে, বসে পড়ার ফাঁকে চেনা গন্ডির বাইরের বিভিন্ন জায়গার গল্পশুনে বেশ ভালোই কাটছে তখন স্কুলজীবনের দিনগুলি। ঘটনাটি পঞ্চম নাকি ষষ্ঠ শ্রেণী মনে করতে পারছি না। খুব সম্ভবত ক্লাস ফাইভের। আমি তখন সেকশন-এ, সেখানে প্রায় ৬০-৭০ জন ছাত্র। পরপর চারটি সেকশন এ-বি-সি-ডি -র একই অবস্থা। চেঁচামেচি কোলাহলে মুখর ক্লাস ফাইভের চারটি সেকশনই।

আমাদের স্কুলের (শুধু আমাদের স্কুলের কিনা জানিনা, তবে আমার দেখা) বেশিরভাগ ক্লাসেই ক্লাস-মনিটর সিলেক্ট হওয়া/করা নিয়ে বেশ রগড় হতো। তখন বুঝতাম না কিন্তু এখন বেশ বুঝি, সেটা ছিল তোষামদের (রাজনীতিও বটে) একটি পন্থা। অর্থাৎ গ্রামের/অঞ্চলের কেউকেটা বা অতি পরিচিত কারও আত্মীয় বা সন্তান হলে এবং সেটি শিক্ষক মহাশয়ের গোচরে এলেই তোমার ক্লাস মনিটরের পদটি পাকা। সে তুমি ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে বিচ্ছুও যদি হও তাতেও। এ প্রায় অলিখিত নিয়ম। একটি ক্লাসে সর্বাধিক দুজন ক্লাস-মনিটর থাকতো। সবচেয়ে মজার বিষয়টি হত তখন, যখন একাধিক পরিচিতের সন্তানেরা একই ক্লাস মায় একই সেকশনে ভিড় জামাত। শিক্ষক মহাশয়েরা কাকে ফেলে কাকে ধরবেন তা ঠিক করতেই দিন দশ/বারো পেরিয়ে যেত। সে সময় ক্লাসরুমে “মাছের বাজার” বসে যেত; শুধুই হই-হুল্লোড় আর চেঁচামেচি। পরে এমনও দেখেছি ক্লাস-মনিটর করতে সেকশন পরিবর্তন করে সামাল দিতে হয়েছে।

এই রকমের কিছু পরিচিতের সন্তানদের সাথে কিছু শিক্ষক মহাশয়দের বিশেষ এক সম্পর্ক ছিল। হতে পারে পূর্ব পরিচিতির জন্য, আবার নাও হতে পারে। প্রত্যেক স্কুলেই কিছু রাশভারী, কিছু হাসিখুশি, কিছু ভালোমানুষ আবার কিছু বেজায় বদমেজাজি গোছের শিক্ষক মহাশয় থাকতেন। এখন যাঁর কথা বলছি ইনি ভীষণ রগচটা মানুষ ছিলেন। তাঁর হাতে চড়-থাপ্পড় খাওয়া ছাত্রের সংখ্যা নেহাত কম ছিল না। আমরা সেই স্যারকে দেখামাত্রই “পড়ি-কি-মরি” করে ছুটে এসে নিজেদের সিটে বসে পড়তাম।

একদিন সদাহাস্য এক স্যারের ইংরেজির ক্লাস ছিল। তিনি খুব সম্ভবত সেদিন আসেননি। ক্লাসের চেয়ার ফাঁকা থাকলে যা হয়; মনের আনন্দে সবাই গল্পগুজব করে, দৌড়ে-খেলে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। হঠাৎ কেউ এসে সবাইকে জানাল “অমুক” স্যার আসছেনা। ব্যাস আর যায় কোথায়, নিমিষেই সব শান্ত। আমি তখনও বাইরে, হয়তো খেয়াল করিনি বা শুনতে পাইনি বার্তাটি। সব চুপচাপ হয়ে গেছে দেখে পিছন ফিরে যতক্ষণে সব বুঝেছি ততক্ষনে স্যার সম্মুখ সমরে। আজ গাল লাল করেই বাড়ী ফিরতে হবে। আর বাড়ি গিয়ে এই অবস্থা দেখেলে, মা আদর তো কোন ছার উল্টে স্যারের হাতে মার্ খেয়েছি জানলে ভাগ্যে আরও গোটা দশেক কিল-ঘুসি জুটবে। অগত্যা কি আর করি! সামনে তাকাতেই রক্ত-চক্ষু নিয়ে স্যার জেই হাতটি তুলেছেন গালে বসাবার জন্য, অমনি বললাম, “স্যার, হরি বাবু আসেননি..?” স্যার কি বুঝলেন জানি না, থমকে গিয়ে বললেন, “জায়গায় গিয়ে বস, আজ আমি ক্লাস নেবো”।

নাহঃ সেদিন চড় আর খেতে হয়নি। বলা বাহুল্য আর কখনোই চড় খাইনি স্যারের হাতে। মারের হাত থেকে বাঁচলাম এবং এ শিক্ষাও হল, সঠিক প্রশ্ন করলে হয়তো ‘সর্বশক্তিমান’-ও ধাক্কা খায়।

 

(ক্রমশ)

International Kolkata Book Fair - GUILD - Bustling Scene at the Communist Book Stall - Abokash images
আমাদের প্যাকেজ ট্যুর

Leave a Reply

Proceed Booking