অসমাপ্ত – ৯

Abokash > Blog > অসমাপ্ত – ৯
শৃগাল কথা

বাঁশবনের পিছন থেকে শুক্লপক্ষের চাঁদ উঁকি দিতে আরও কিছুটা সময় বাকি আছে। হাত বিশেক দূরের জিনিষ তখনও বেশ স্পষ্ট। তালতলা মাঠের আলপথ ছেড়ে বোষ্টম-পুকুর যখন পোঁছেছি, ঢং ঢং করে ঝাঁঝ-ঘন্টা বেজে উঠল পাশের পাড়ায়। ইতিউতি শঙ্খধ্বনিও। ব্যাট, বল, উইকেট হাতে বাড়িমুখো আমরা জনা আষ্টেক খুদের দল।

শ্মশানঘাটের পাশের সাঁকো যখন পেরোচ্ছি বিচিত্র এক শব্দে দাঁড়িয়ে পড়লাম সবাই। কান্না, হাসি, বিদ্রুপ, আদেশ, গর্জন; কি নেই তাতে!! এমন অদ্ভুত-কিম্ভূত ডাক আগে কখনও শুনিনি। বলাই বাহুল্য, বুকে তখন হাতুড়ি পেটাচ্ছে যেন কেউ। বাকিদের অবস্থাও খারাপ বই ভালো না। ভয়ে কাঠ হয়ে একে অপরের সাথে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আমরা। টানা প্রায় মিনিট দেড়েক চলল সেই আস্ফালন। 

বাঘা; ভীষণ সাহসী আর তাগড়াই এক পোষ্যি। আমাদের সবার খুব প্রিয় কুকুর। সে আর তার এক ছেলে লালু কোথা থেকে জানি তেড়ে এল এদিকেই। আমাদের দেখে তারাও দাঁড়িয়ে পড়েছে। ক্ষনিকেই শব্দ লক্ষ করে ঘুরে তাদের প্রবল বিক্রমে চুপ করিয়ে দিল সেই অপার্থিব ডাকগুলি। ওদের দেখেই যেন একটু সাহস ফিরল মনে। সময় নষ্ট না করেই সবাই দৌড় দিলাম বাড়ির দিকে।

হ্যাঁ, সেই প্রথম; নিজের কানে শোনা তাও হাত বিশেক দূর থেকেই। এতদিন গল্প শুনতাম দাদু-ঠাকুমার কাছে। তারা নাকি কাঁকড়া খেতে আসে পুকুর ঘাটে রাত-বিরেতে। লেজ ডুবিয়ে দেয় গর্তে আর যেই কাঁকড়ারা কামড় বসায় লেজে, অমনি ওরা টেনে বার করে লেজ। থাবা চাপা দিয়ে কুট-কুট শব্দ করে খেয়ে নেয় ভাঙা দাড়াগুলি। তাইতো লেজ অতো মোটা ওদের, কাঁকড়ার কামড়েও কিস্যু হয়ে না। কখনওবা ভোর রাতে খেয়ে যায় পাকা কাঁঠাল, কখনও শশা। ওদের ডাক শুনে ভেংচি কাটলে নাকি পটি করে যায় বাড়ির উঠোনে। আরও কত কি..! 

এর আগে দূর থেকে দেখেছি বটে কিন্তু ডাক শুনিনি কখনো। এতো গল্পে শোনা হুক্কা-হুয়া নয়; এ ডাক যে ভয়ঙ্কর। মনে হলো পৈশাচিক হাড়হিম করা এক হাসি।

তখন ক্লাস টেন, সামনেই মাধ্যমিক। ইংরিজির টিউশন পড়তে যেতে হত অনেক দূরে। সাইকেলে প্রায় ঘন্টা খানেকের পথ। এমনই একদিন টিউশন পড়ে ফিরছি; রাত প্রায় সওয়া ন’টা। শীতের রাত্রি; ৯-টা মানেই প্রায় মাঝরাতের সমান। একহাতে সাইকেলের এক হ্যান্ডেল অন্যহাতে টর্চ। বাড়ি থেকে তখন আর মাইলটাক দূরে, হঠাৎ টর্চ গেল নিভে।

রাস্তার একপাশের বাঁশের ঘন জঙ্গল অন্য পাশে খেলার মাঠ। খানা-খন্দে ভরা মোরামের একচিলতে পথ। জনমানবহীন সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার রাত্রে অসতর্কে গিয়ে পড়লাম একটি গর্তে; ব্যাস ছিটকে গিয়ে চিৎপটাং..! সাইকেল, টর্চ, ব্যাগ আর আমি, কে যে কোথায় এই নিঝুম অন্ধকারে বোঝা খুব মুশকিল।

পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাওয়ার চেয়ে বেশী কষ্ট হতে লাগল টর্চটি হাতছাড়া হওয়ায়। অন্ধের মতো হাতড়ে, হামাগুড়ি দিয়ে বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর কিছুটা দূর থেকে পাওয়া গেল যক্কের ধন টর্চটি। খানিক চাপ্পড়-থাপ্পড়ের চেষ্টায় অবিশ্যি ঘুম ভাঙল তার। টিমটিমে আলো চারপাশে ছড়াতেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল, অদূরেই খান আষ্টেক জ্বলন্ত চোখ। আলো বরাবর এদিকেই তাকিয়ে। 

মায়ের থেকে একবার গল্প শুনেছিলাম, তাঁর ছোটবেলায় মামাবাড়ির পাশের কোনএক পাড়া থেকে এক সন্ধ্যায় সদ্যজাত একটি শিশুকে নাকি নিয়ে চলে গিয়েছিল এরাই, ঘরের দরজা খোলা পেয়ে। এছাড়া হাঁস, মুরগি আকছার নিয়ে যেত সুযোগ পেলেই।

নাহঃ ভয় পেলে চলবে না; সাহস জুগিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ব্যাগ ও সাইকেল তুলে চেপে বসতেই, আমার সামনে দিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার করে পাশের বাঁশবনে ঢুকে গেল একপাল শেয়াল..!

 

(ক্রমশ)

Indian Grey Jackal in a Foggy Paddy Field, Midnapore Winter Morning - Abokash images
আমাদের প্যাকেজ ট্যুর

Leave a Reply

Proceed Booking